গান-বাজনা ও এর সামাজিক কুপ্রভাব।

গত কয়েক বছরে নাচ-গানের চর্চা অকল্পনীয় মাত্রায় বেড়েছে। দেশে যেখানে শিক্ষা-গবেষণা ও সুনাগরিক তৈরিতে কাংক্ষিত অগ্রগতি নেই, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ নেই, সেখানে চরিত্রবিধ্বংসী নাচ-গানের পেছনে অনুদান বা বিনিয়োগ তথা আগ্রহের অন্ত নেই। যেখানে রোজই চিকিৎসার অর্থ না পেয়ে মৃত্যুর জন্য প্রহরগোনা অসহায় মানুষের করুণ মুখ পত্রিকায় ছাপা হয় সেখানেই বহুজাতিক কোম্পানি ও বড়-বড় ব্যবসায়িক ইন্ডাস্ট্রিগুলো তাদের উপার্জিত অর্থের অনেকটাই ঢালে নৃত্য ও সঙ্গীতের পেছনে! এখনো যেখানে বিরাটসংখ্যক মানুষের বাস দারিদ্রসীমার নিচে, আজো যারা পেটের আগুন নেভাতে গিয়ে নিজের ঈমান পর্যন্ত বিকিয়ে দিতে বাধ্য হয়, সেখানকারই একশ্রেণীর নাগরিক নির্দ্বিধায় পঞ্চাশ হাজার টাকায় কেনে এক সন্ধ্যার কনসার্টের টিকেট! যেখানে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক নয়, সেখানে আবার অনেক কিন্ডারগার্ডেনে নিষ্পাপ শিশুদের নৃত্য ও সঙ্গীত শেখা বাধ্যতামূলক! আমরা (জাতি) যে আজ নাচ-গানে কতটা মেতেছি তা প্রমাণে বোধ হয় আর কিছু বলার দরকার নাই। তারপরও খানেকটা ইঙ্গিত দেয়া যাক। আসলে ব্যঙের ছাতার মতো যত্রতত্র গজিয়ে ওঠা টিভি চ্যালেনগুলোই নিজেদের জনপ্রিয়তা বাড়াতে নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে নেমেছে মুসলিম সমাজকে গানে মাতাল বানাতে। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে নীতি ও আদর্শ বিবর্জিত মুনাফালোভি ব্যবসায়ী কোম্পানিগুলো। ‘ক্লোজ আপ নাম্বার ওয়ান, ‘গাও বাংলাদেশ গাও, ‘ক্ষুদে গানরাজ, ‘নির্মাণশিল্পীদের গান, গার্মেন্ট শ্রমিকদের গান, ‘শাহরুখ খান লাইভ ইন কনসার্ট, ‘ডেসটিনি ট্রাইনেশন বিগ শো ‘কনিয়া চ্যানেল আই সেরা কণ্ঠ’ ‘পাওয়ার ভয়েস ২০১২ ‘নাচো বাংলাদেশ নাচো’ইত্যাদি চটকদার সব শিরোনামের আড়ালেই রয়েছে এ দুই শ্রেণীর বস্তুগত উদ্দেশ্য।

মিডিয়ার অকল্পনীয় উন্নতির সুবাদে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীই মাতাল আজ এসব আয়োজনকে ঘিরে। দুঃখজনক সত্য হলো এসবে শুধু তরুণ প্রজন্মই মেতে নেই, মেতে আছেন একশ্রেণীর অপরিণামদর্শী অভিভাবক মহলও। নাচ-গান শেখানোর পেছনে নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ যদি তারা না ঢালেন, তবে তো নৃত্য-সঙ্গীতের স্কুলগুলো এত রমরমা ব্যবসা করতে পারে না। ইদানীং বিশ্বে অনেক কিছু নিয়েই জরিপ চালানো হয়। নাচ-গানে বিনিয়োগ-আত্মনিয়োগ নিয়ে যদি কোনো জরিপ পরিচালিত হয় তবে বাংলাদেশের মতো একটি গরিব দেশের নাম যে ওই তালিকার অন্যতম শীর্ষস্থানে থাকবে তাতে সন্দেহের কিছু নেই।

এতসব আয়োজন ও আয়োজকদের বদান্যতায় এ জাতি এতটাই মেতেছে, দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জর এ জাতি এতটা মাতাল হয়েছে যে ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষ কোনো শ্রেণীর মানুষই গানের জোয়ারে গা না ভাসিয়ে বসে থাকছে না। আর সে জোয়ারেই ভেসে যাচ্ছে তরুণ প্রজন্মের নীতি-আদর্শ ও কাম্য সচ্চরিত্র। যে ইভটিজিং ও যৌন অপরাধের ব্যাপক বৃদ্ধিতে এ দেশের চিরসবুজ শান্তির নিবাসগুলো জ্বলছে অশান্তির কালো আগুনে তার অনেকখানি দায় এসব নাচ-গানকেন্দ্রিক আয়োজনের। অবৈধ ভালোবাসা আর ভোগ জীবনের আহ্বানে সদা সরব এসব গান কাউকে স্বস্তি দিচ্ছে না। বরং তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে পাপের আগুনে ঘি ঢেলে দিচ্ছে।

এমন কোনো স্থান নেই যেখানে গেলে গানের আযাব থেকে সম্পূর্ণ পরিত্রাণ মেলে। ঘরে বলেন বা বাইরে, পথে বলেন কিংবা যানবাহনে সর্বত্র ওই কানে অগ্নিবর্ষণকারী গানের আওয়াজ। বাসায় ঘুমিয়ে, পড়াশোনা করে এমনকি পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করতে গিয়েও নিস্তার নেই এই গানের অশ্রাব্য আওয়াজ থেকে। ঘর থেকে বের হলেন তো সেরেছে। কোথায় যাবেন দোকানে? সেখানেও কিন্তু গানের উপকরণের অভাব নেই। হেঁটে পথ পাড়ি দেবেন? সেখানেও দেখবেন মোবাইলে সজোরে গান শুনতে শুনতে কেউ না কেউ পথ চলছে। আর বাস বা যানবাহনের কথা তো বলাইবাহুল্য। বড় পরিতাপের বিষয় হলো একমাত্র নিরাপদ স্থান আল্লাহর ঘর মসজিদেও এই অভিশপ্ত গানের আওয়াজ ইদানীং কানে আসছে। অসচেতন কিছু মুসল্লী তাদের মোবাইলের রিংটোন হিসেবে গান ব্যবহার করায় এমনটি হচ্ছে। একজন মুসল্লী কিভাবে নিজের ছায়াসঙ্গী এই মোবাইল রিংটোন বানান গানকে তা কিছুতেই বোধগম্য নয় !

কেবল সংবাদ শোনা কিংবা নিছক ক্রিকেট খেলা দেখার অজুহাতে যারা অপছন্দকে সঙ্গী করেই কদাচিৎ টিভি দেখেন, তারাও আজ বিপদে। এসবের ফাঁকে বিজ্ঞাপনগুলোতে নাচ-গানের এমন দৃষ্টিকটু অনুপ্রবেশ থাকে যা তাদের মতো ‘স্বল্পপুঁজির’ ঈমানদারদেরও টিভির সামনে ঘেঁষতে দ্বিধান্বিত করে।

বর্তমানে যুব সমাজের সুস্থ মন মানসিকতা ,মেধা নষ্টের অন্যতম কারণ হচ্ছে গান-বাজনা। শিক্ষামূলক নানা বিষয় বাদ দিয়ে নারী পুরুষের আকর্ষনজনিত রোমান্টিক গান এবং নানা গাল-গল্পে ভরা বর্তমান সঙ্গীত জগৎ। যা নারী পুরুষকে অবৈধ সম্পর্কের সৃষ্টিতে উৎসাহিত করে। নারী পুরুষের সু-ধারণা নষ্ট করে, কু-ধারনার জন্ম দেয়। যা যুব সমাজকে জিনা-ব্যভিচারে উদ্বুদ্ধ করে। ক্ষতি করে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ালেখার। তাই সকল কুরুচিপূর্ণ গানকে আসুন বর্জন করি ।

আমরা ছোটবেলায় ‘নিশা লাগিলোরে, বাঁকা দুই নয়নে নিশা লাগিলোরে’ অথবা ‘আমায় এতো রাতে কেনে ডাক দিলি, প্রান কোকিলারে……. টাইপের গানের কথা শুনেছি। কিশোর বয়সে অনেক গানের পাশাপাশি আইয়ুব বাচ্চুদের ‘মন চাইলে মন পাবে, ‘দেহ চাইলে দেহ’ টাইপের গান অথবা ‘দুই দিনের এই দুনিয়া, কি হইবে দিন গুনিয়া, করোনা ফুর্তি করোনা, হাল আমলে জনপ্রিয় গায়িকা সালমার ‘দিওনাগো বাসর ঘরের বাত্তি নিভাইয়া, অন্ধকারে বন্ধ ঘরে যাবো মরিয়া……’ ইত্যাদি গান শুনেছি অথবা শুনছি।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, শিশু অথবা কিশোর মন আবেগপ্রবন ও বিবেচনা শক্তি কম হওয়ায় তাদের মনে এই সব গানের কথা বিরুপ প্রভাব ফেলবে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। ভাবতে খট্কা লাগে যখন ক্যাটরিনা কাইফের মতো সুন্দরী আবেদনময়ী নায়িকার মুখে শোনা যায় ‘জারা-জারা টাচ মি, টাচ মি, টাচ মি/ কিস মি, কিস মি, কিস মি’ ইত্যাদি গান তখন তাদের (তরুণ-তরুণীদের) মনের তা কি প্রভাব ফেলে ! আমরা কি তা ভাবার প্রয়োজন অনুভব করি?

অশ্লীল গানের কথা বাদ দিলেও আমরা ছেলে বুড়ো সবাই গান বলতে রোমান্টিক গানকেই বুঝি। ছোটবেলা থেকেই আমরা এই ধারনার সঙ্গেই পরিচিত। বলা বাহুল্য, বর্তমানেও প্রচলিত ও প্রকাশিত গানের সম্ভবত ৯৯ ভাগই প্রেমের গান। যেন প্রেম ছাড়া গান অসম্ভব ! সিনেমার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এতে করে ছোটবেলা থেকেই একটা শিশু  প্রেম ভালোবাসা সম্বন্ধে ভালোই শিক্ষা পাচ্ছে। এই পর্যন্ত হলেও হয়তো সমস্যা হতো না কিন্তু বর্তমানে পার্কে, অথবা রাস্তাঘাটে প্রেমের রুপ দেখে মাঝে-মাঝে শিউরে উঠতে হয়। এটা কি সংস্কৃতির বিকৃতির পাশাপাশি মানসিক বিকৃতিও নয়? এর জন্য দায়ী কি? ছোটবেলা খেকেই আমরা মনের ভাষা প্রকাশকারী গানের পাশাপাশি দেহের ভাষা প্রকাশকারী গান শুনে বড় হয়েছি।

আসলে নাচ-গানের ক্ষতিকারিতা এত বেশি যে তা ইসলামে নাজায়েয হওয়ার জন্য আলাদা কোনো প্রমাণের দরকার পড়ে না। তদুপরি মহান আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বহু ভাষ্য থেকে তা হারাম হওয়া প্রমাণিত। যেমন : আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, (অনুবাদ দেওয়া হলো)

 ‘’আর মানুষের মধ্য থেকে কেউ কেউ না জেনে আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বেহুদা কথা খরিদ করে, আর তারা ঐগুলোকে হাসি-ঠাট্টা হিসেবে গ্রহণ করে, তাদের জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।‘’ (সূরা লুকমান, আয়াত : ৬)

‘’ গান-গায়িকা এবং এর ব্যবসা ও চর্চাকে হারাম আখ্যায়িত করে রাসূল সাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বলেনঃ ‘তোমরা গায়িকা (দাসী) কেনাবেচা করো না এবং তাদেরকে গান শিক্ষা দিও না। আর এসবের ব্যবসায় কোনো কল্যাণও নেই। জেনে রেখ, এ থেকে প্রাপ্ত মূল্য হারাম।‘’ (তিরমিযী : ১৩২৯; ইবন মাজা : ২১৬৮) **কাজী আবু বকর ইবনুল আরাবী ‘আহকামুল কুরআনে’ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক ও ইমাম মালেকের বরাত দিয়ে হযরত আনাস (রা) একটি রেওয়ায়াত উদ্ধৃত করেছেন। তাতে বলা হয়েছে , রাসূল সাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বলেছেনঃ ” যে ব্যক্তি গায়িকা বাঁদীর মাহফিলে বসে তার গান শুনবে, কিয়ামতের দিন তার কানে গরম শীসা ঢেলে দেয়া হবে।”

   (এ প্রসঙ্গে একথা জেনে নেয়া উচিত যে, সে যুগে গান-বাজনার “সংস্কৃতি” বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বরং পুরোপুরি বাঁদীদের বদৌলতেই জীবিত ছিল। স্বাধীন ও সম্ভ্রান্ত মেয়েরা সেকালে “আর্টিষ্ট” হননি। তাই নবী (সা) গায়িকাদের কেনা-বেচার কথা বলেছেন, দাম শব্দের সাহায্যে তাদের “ফী” র ধারণা দিয়েছেন এবং গায়িকা মেয়েদের জন্য “কাইনা” শব্দ ব্যবহার করেছেন। আরবী ভাষায় বাঁদীদের জন্য এ শব্দটি বলা হয়।)

** অন্যত্র রাসূল সাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বলেছেনঃ ‘আমার উম্মতের কিছু লোক মদের নাম পরিবর্তন করে তা পান করবে। আর তাদের মাথার ওপর বাদ্যযন্ত্র ও (গায়ক-গায়িকাদের) গান বাজতে থাকবে। আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে মাটিতে ধ্বসিয়ে দেবেন। এবং তাদের মধ্যে অনেককে শূকর ও বাঁদর বানিয়ে দেবেন।’ বাইহাকী,সুনান : ১৭৮৪৫; ইবন মাজা : ৪০২০; ইবন হিব্বান : ৬৭৫৮।

**তিঁনি আরও বলেন,‘আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু লোক সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, রেশম, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল সাব্যস্ত করবে।’বুখারী : ৫৫৯০। ** আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ ‘পানি যেমন (ভূমিতে) তৃণলতা উৎপন্ন করে তেমনি গান মানুষের অন্তরে নিফাক সৃষ্টি করে।’ (ইগাছাতুল লাহফান ১/১৮৭)

অথচ, সবাই জানেন বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে মাদক ও পাপাসক্তির ক্রমবিস্তার প্রায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। হাজার প্রচারণা ও বিজ্ঞাপনেও নেশার ছোবল থেকে এদের রক্ষা করা যাচ্ছে না। এদের হাতেই রোজ খুন-ধর্ষণসহ ইত্যাকার নানা অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে। এসব নাচ-গানে ডুবে তারা মানবজীবনের মূল লক্ষ্য হারিয়ে হতাশার রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তাই দেখা যায় সুখী ও উন্নত দেশগুলোতেই আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি। আসলে পরকাল ভাবনাই মানুষের কুপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে। মানুষের ভেতরে সুপ্রবৃত্তি ও সদগুণাবলি জাগিয়ে তোলে। আর নাচ-গানের মূল সাফল্যই এখানে যে তা পরকাল ভাবনাকে একেবারে ভুলিয়ে দেয়। মানুষের সুকুমার বৃত্তির ওপর পর্দা ফেলে ক্ষণিকের বস্তুতে মজে রাখে। সাহাবী ও তাবেয়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী গান ও বাদ্যযন্ত্র বহু গুনাহর সমষ্টি। যেমন : *নিফাক বা মুনাফেরির উৎস * ব্যভিচারে অনুপ্রাণিতকারী *মস্তিষ্কের ওপর আবরণ *কুরআনের প্রতি অনীহা সৃষ্টিকারী * আখিরাতের চিন্তা নির্মূলকারী ও গুনাহের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টিকারী এবং ঈমানী চেতনা বিনষ্টকারী। তাই আজ বড্ড প্রয়োজন এ নাচ-গানের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করা। মসজিদ, মাহফিলে, আলোচনার টেবিলে এবং সব ধরনের মিডিয়াতে এ ব্যাপারে সর্বশ্রেণীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা। এ জাতির অস্তিত্ব, সমৃদ্ধি ও মঙ্গলের স্বার্থেই তা জরুরী। হ্যা, নাচ-গান তথা অসুস্থ বিনোদনের প্রতি মানুষকে নিরুৎসাহিত করার পাশাপাশি সুস্থ বিনোদনের দিকেও পথনির্দেশ করতে হবে।

বিনোদন মাধ্যমের উন্নতির যুগে মানুষের জন্য কুরআন-হাদীসের আলোচনা, হামদ-নাত, ইসলামী সঙ্গীতও সহজলভ্য করতে হবে এ জন্য দরকার এসব কাজে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া। এসবের সঙ্গে জড়িতদের বুদ্ধি-পরামর্শ ও আর্থিক সাহায্য দিয়ে এগিয়ে যেতে সাহায্য করা। কারণ, মানুষকে উত্তম বিকল্প না দেয়া পর্যন্ত মানুষ কোনোদিন মন্দ থেকে বিরত থাকবে না। আল্লাহ তা’আলা আমাদের সকলকে গান-বাদ্যের ফিতনা থেকে দূরে থাকবার এবং এসব বন্ধে কাজ করার তাওফীক দিন। আমীন।

(তথ্যসূত্র :   http://sorolpath.wordpress.com)

সংকলনে ও প্রচারে : ‘প্রজেক্ট টু দাওয়াহ

এত সুর আর এত গান

১.

“ঘুম ঘুম চাঁদ ঝিকিমিকি তারা, এই মায়াবী রাত

আসেনি তো বুঝি আর জীবনে আমার…”

আজো স্পষ্ট মনে পড়ে আমার মা আমাকে বালিশে শুইয়ে মৃদুভাবে দোল দিচ্ছেন আর গান গাইছেন। অথবা যশোরের সে শীতের সকালের কথা – নরম বিছানায় ততোধিক নরম রোদে শুয়ে আছি; কানে ভাসছে যীশু দাসের গান “নাম শকুন্তলা তার…”। এর পরে বড় হতে লাগলাম, রিক্সাভাড়া বাঁচিয়ে কতজন কত কি কেনে – আমি কিনতাম গান। নিয়াজ মুহাম্মদ চৌধুরি, কুমার শানুর “পপ” হিন্দি, রিকি মার্টিনের “মারিয়া” বা লাকি আলির “সিফার”। উঠতি বয়স – নিজের ভালোলাগার উপর দন্ডি ঘোরাত স্কুলে আধুনিক হতে পারলাম কিনা, বন্ধুদের সাথে তাল মিলাতে পারলাম কিনা সে বোধ। আরো বড় হলাম – পুরনো বাংলা গান, রবীন্দ্র, নজরুল, গজল, ক্লাসিকাল আর সেমি ক্লাসিকে নিজের স্বকীয়তা খুঁজে পেলাম। ভাল লাগত এ.আর.রহমান আর জীবনমুখী। পাশ্চাত্য আমায় বেশি টানেনি। বড় জোর কান্ট্রি সংস, ডেনভার কি লোবো। গান শোনার সময় বিচার করলে আমাকে কেউ টেক্কা দিতে পারতোনা। গাইতামও না বাজাতামও না , কেবলই শুনতাম; নামায, ক্বুরান পড়া, খেলা আর ক্লাসে থাকার সময়টুকু বাদ দিলে বাকি প্রায় পুরো সময়টাতেই গান শুনতাম। পড়তে বসলে তো বটেই, ঘুমানোর সময়, ঘরে যতক্ষণ থাকতাম গানও চলতে থাকতো। সাইকেলে চড়ে ভার্সিটি যাচ্ছি – কানে গোঁজা গানের তুলো। ভারি অহংকার করে বলতাম – আমার কাছে ৩০ গিগাবাইট গান আছে – সব আমার শুনে শুনে বাছাই করা গান! এটা সে সময়ের কথা যখন আচার-অনুষ্ঠানেই আমার ইসলাম সীমিত হয়ে ছিল। পরে যখন ইসলামের স্বরূপ নিয়ে কিছুটা পড়াশোনা শুরু করলাম তখন প্রথম আমি আমার জীবন পরিব্যপ্ত করে থাকা সঙ্গীত নামক শিল্পটির সমস্যাগুলো অনুভব করতে লাগলাম।

২.

ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী সবচেয়ে বড় গূনাহ হল শিরক অর্থাৎ আল্লাহর গুণাবলী, বৈশিষ্ট্য ও অধিকারের ভাগ অন্য কাউকে দেয়া। সুফিদের তথাকথিত মরমী গান হল এই শিরকের আড্ডা। যেই লালন শাহের নামে আমরা এক ঢোক পানি বেশি খাই সেই লালন সাঁই প্রচার করে গেছে –

“যেহিতো মুরশিদ, সেহিতো রসূল / এই দুইয়ে নেই কোন ভুল

মুরশিদ খোদা ভাবলে যুদা / তুই পড়বি প্যাচে।”

অথচ ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে “আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর দাস ও বার্তাবাহক”। আল্লাহ ও তার রসুল মুহাম্মদ (সাঃ) কখনোই এক নয় বরং দু’টো সম্পুর্ণ দু”টি ভিন্ন সত্তা এবং তাদের মধ্যে প্রভু-ভৃত্য সম্পর্ক ছাড়া অন্য কিছু নেই।

বাউল শাহ আব্দুল করিম বয়াতির একটি গান হল –

“শুধু কালির লেখায় আলিম হয় না মন রে/ কানা অজানা কে যে না জানে/

আল্লাহ নবী আদম ছবি /এক সূতে বাঁধা তিন জনে”

এ গান লালনের দ্বিত্ববাদকে ছাড়িয়ে ট্রিনিটিতে এসে ঠেকেছে।

বিষয়বস্তুর দিক দিয়ে গানের প্রধান অবলম্বন “ভালোবাসা”। ভালোবাসার আতিশয্যে প্রায়ই ভালোবাসার বস্তুটিকে আল্লাহর জায়গায় বসিয়ে দেয়া হয়, হোক সে মানুষ কিংবা দেশ। “প্রথমত আমি তোমাকে চাই … শেষ পর্যন্ত তোমাকে চাই” – কোথাও কিন্তু আল্লাহর কোন অংশ নেই, খালি “তোমাকেই” এর জয়জয়কার। কেউ ভাবতে পারেন এই “তুমি” তো আল্লাহও হতে পারে। কিন্তু সুমন আল্লাহর কথা ভেবে এই গান বাঁধেননি, এ গান যারা গায় আর শোনে তারা আর যাই হোক আল্লাহকে খুশি করতে এ গান শোনেনা।

“ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকাই মাথা”- আমাদের অনেকেরই খুব প্রিয় একটা দেশাত্মবোধক গান। দেশাত্মবোধ মানুষের প্রকৃতিজাত একটা ব্যাপার, এটা মানুষের মধ্যে থাকবে তাই কাম্য। কিন্তু তাই বলে দেশের মাটিতে কপাল ঠেকাতে হবে কেন? গানটায় সম্বোধন করা হয়েছে কাকে? মাটিকে। এটা ঠিক আমরা মাটির উপর সিজদা করি কিন্তু সে জন্য দেশের মাটি শর্ত নয়, গোটা পৃথিবীর মাটিতে সিজদা করা যায়। সিজদা কাপড়ের উপর করা যায়, মার্বেলের উপর করা যায়; আল্লাহকে উদ্দেশ্য করলে পবিত্র যে কোন কিছুর উপরই সিজদা করা যায়। গানটাতে “তোমার পরে ঠেকাই মাথা” না হয়ে “তোমার কোলে রাখি মাথা” হতে পারত। কিন্তু রবিঠাকুর তা লেখেননি। কেন লেখেননি?

এই গানটা “বন্দে মাতরম” যুগের যেখানে মা/দেবী/দেশ একটা আরেকটার সাথে মিশিয়ে মানুষকে তাঁতিয়ে দেয়া হয়েছিল। আনন্দমঠের প্রথম সংষ্করণে ইংরেজ তাড়ানোর কথা থাকলেও প্রভুর দাপটে পরের সংষ্করণগুলোতেই ইংরেজের জায়গায় যবন তথা মুসলিম তাড়াতে কলকাতার বাবুদের উদ্বুদ্ধ করা হয়। বঙ্কিম যেখানে “বন্দনা”/উপাসনা বলে থেমে গিয়েছিলেন সেখানে রবিবাবু কিভাবে উপাসনা করা যায় তাই এ গানে গেয়ে গেছেন। এখনো বিশ্বাস হচ্ছেনা? আচ্ছা পরের লাইনগুলোও পড়ুন –

“তুমি মিশেছ মোর দেহের সনে, তুমি মিলেছ মোর প্রাণে মনে,

তোমার ঐ শ্যামলবরন কোমল মূর্তি মর্মে গাঁথা।”

শিরকের আরেকটি অফুরন্ত ভান্ডার হল হিন্দি গান। অনেক দিন হয়ে গেল হিন্দি গান শোনা হয়না, কিন্তু চলতি পথে মুফতে শোনা গানগুলার মধ্যে আমি যে পরিমাণ শিরকের খোঁজ পাই তাতে বলিউডের নেট শিরকের প্রোডাকশনের কথা ভাবতেও ভয় লাগে। “তুঝে রাবসে ভি জিয়াদা ভারোসা কিয়া” বা “ইয়া আলি, মদদ আলি” টাইপের চটুল গানে তো শিরক আছেই, বোম্বে ছবির “তুহি রে” এর মত কালোত্তীর্ণ গানেও “মওত ঔর জিন্দেগি তেরে হাতো মে দে দিয়া রে” বলে নিজের প্রেমিকার হাতে অবলীলায় আল্লাহর ক্ষমতা দিয়ে দেয়া হয়েছে।

লতা-কিশোরের একটা গান আমার খুব প্রিয় ছিল এর অসাধারণ কম্পোসিশনের কারণে-

“কারভাটে বাদালতে রেহি সারি রাত হাম, আপ কি কাসাম… আপ কি কাসাম”

অথচ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে শপথ করা হারাম, তা শিরকের অন্তর্ভুক্ত।

এই শিরক এত ভয়াবহ একটা পাপ যার সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন –

“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে অংশী স্থাপনকে ক্ষমা করেননা কিন্তু তিনি এর চেয়ে ছোট (পাপ) যাকে খুশি ক্ষমা করেন”

এর শাস্তি অনন্ত আগুন।

৩.

আধ্যাত্মিক গানগুলোর আরেকটি ভয়াবহ সমস্যা হল এগুলোতে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের পরিপন্থী অনেক আদর্শ প্রচার করে থাকে। যেমন “এই যে দুনিয়া কিসের লাগিয়া এত যত্নে বানাইয়াছেন সাঁই” – গানটির পরতে পরতে কুফরি মতবাদ ছড়িয়ে আছে। আল্লাহ জ্বীন এবং মানুষকে যে তাঁর ইবাদাতের উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে – এই সত্যটাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে বিভিন্ন বিভ্রান্ত দর্শনের সাহায্যে। “যেমনি নাচাও তেমনি নাচে, পুতুলের কি দোষ” – এই চিন্তাধারা মানুষের কর্মফল ও পরপারে জবাবদিহীতার মূলে কুঠারাঘাত করে। আবার “তুমি বেহেশ্ত তুমি দোযখ তুমি ভালো-মন্দ” – এই দর্শন সবকিছুতেই আল্লাহর অস্তিত্ব খুঁজে পেয়ে প্রকারান্তরে আল্লাহর অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে। রবিবাবুও এ ধারণা প্রচার করে গেছেন এমন এক গানে যা আমাদের কাছে খুব নিরীহ মনে হয় – “আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে, নইলে মোদের রাজার সনে মিলবো কি শত্তে ”। রবীন্দ্রনাথের পূজার গান আর নজরুলের শামা সংগীত বাদ দিলেও আমরা খুব ভালোবেসে শুনি এমন অনেক রবীন্দ্রসংগীত এবং নজরুলগীতিতে ভুরি ভুরি শিরক আর কুফর ছড়িয়ে আছে।

“তারে এক জনমে ভালোবেসে ভরবেনা মন ভরবেনা” বাংলার সিনেমার খুব জনপ্রিয় এই গানে খুব স্পষ্টভাবেই হিন্দু-বৌদ্ধ দর্শনের জন্মান্তরবাদ প্রচার করা হয়েছে।

কাউকে যদি বলা হয় “তোমার বাবা খুব নিষ্ঠুর, মনে কোন দয়া-মায়া নেই”, তাহলে তেড়ে-ফুঁড়ে মারতে না গেলেও মনে ব্যাথা কি সে পাবেনা? আমরা দাবী করি আমরা মুসলিম অথচ পবনদাস বাউলের গান শুনি-শুনাই –

“দিন-দুনিয়ার মালিক খোদা, দিল কি দয়া হয়না? তোমার দিলকি দয়া হয়না?”

উদার মুসলিম হতে গিয়ে আল্লাহকে আর কত অপমান করব আমরা?

আমরা নিত্তদিন যে গানগুলো শুনছি তার শিরক আর কুফরের তালিকা করতে গেলে পিএইচডি করা লাগবে। আসলে ইসলামের মৌলিক জিনিসগুলো সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান খুবই কম। সে জ্ঞান থাকলে এই গানগুলোর ইসলামবিধ্বংসী রূপ আমাদের চোখে পড়ত।

৪.

অনেকের মনে হতে পারে আমি বাড়াবাড়ি করছি। অনেকে যুক্তি দেখাতে পারে গায়ক তো আর ঐ অর্থে গাইছেননা। আমরা মুখের কথায় মানুষকে বিচার করি, তার মনে কি আছে সেই খবর নেয়া দুরুহ কাজ। কেউ যদি আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে নোংরা ভাষায় তাকে অপমান করে একটা গান গায় তবে সে চাপাতির কোপ না খেলেও লাঠির বাড়ি যে খাবে তা নিশ্চিত এবং তার “আমি তো আসলে এটা ‘মিন’ করিনি” – এ জাতীয় কোন অজুহাতই ধোপে টিকবেনা। মনে যদি ভালো থেকেই থাকে তবে মুখে খারাপ কেন বলা?

আমি নিজেই দাবী করতাম যে আমি তো আর হিন্দি বুঝিনা, শিরকওয়ালা গান শুনলে আমার কেন পাপ হবে। যদি কোন উর্দু না জানা মানুষ সারাদিন “পাক সার জমিন সাদ বাদ” শুনে এবং জোর ভল্যুমে অন্যদেরও শোনায় তবে সে ঠিক কি জাতের বাঙ্গালী তা বিবেচ্য। তেমনই গান থেকে যদি কেউ শিরক-কুফরি শিক্ষা না নিয়েও থাকে বা শিরক/কুফরির নিয়ত না করেও থাকে তবুও সে আখেরে কিভাবে আল্লাহর কাছে পার পাবে তা ভাববার বিষয়। কারণ আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত আছে যে রসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন –

“A person may speak a word, not realizing what he is saying, and he will fall because of it into the Fire further than the distance between the East and West.”

Bukhaari (5996) and Muslim (5304)

আমরা চোখ বন্ধ করে রাখতে পারি কিন্তু তার মানে এই না যে তাহলে সমস্যাটা চলে যাবে। আমরা কোন কিছুকে শিরক আর কুফর বলে চিনতে পারছিনা মানে এই নয় যে সেটা শিরক বা কুফর নয়। আর শয়তানের পদ্ধতি এটাই যে সে খারাপ জিনিসগুলোকে আমাদের সামনে সুশোভিত করে তোলে। আমরা দেখেও দেখিনা, শুনেও শুনিনা – অন্য কেউ ভুলটাকে আঙুল তুলে দেখিয়ে দিলে গোস্বা করি।

৫.

আমাদের প্রিয় নাবী মুহাম্মাদ (সাঃ) ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন –

“আমার উম্মাতের মধ্যে নিশ্চয়ই এমন কিছু মানুষ আসবে যারা ব্যভিচার, রেশমি কাপড়, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে” (সহিহ বুখারি – ৫৫৯০)

বাদ্যযন্ত্র শুধু নিষিদ্ধই নয়, কোন মাত্রার নিষিদ্ধ তা এ হাদিস থেকে বেশ বোঝা যায়। আরো বেশি বোঝা যায় এ ভবিষ্যদ্বাণী কতটা সত্যি।

সুরা লুক্বমানের ষষ্ঠ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন –

“আর মানুষের মধ্য থেকে অজ্ঞতাবশতঃ আল্লাহর পথ থেকে (মানুষকে) বিভ্রান্ত করার জন্য অসার বাক্য ক্রয় করে এবং তারা আল্লাহর প্রদর্শিত পথকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে; তাদেরই জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।”

এই “অসার বাক্য” এর মধ্যে যে গান-বাজনা অন্তর্গত তা সকল মুফাসসির একমত। খেয়াল করলে দেখা যায় এখানে আল্লাহ ভয়ংকর বা মর্মন্তুদ শাস্তির কথা বলেননি, বলেছেন অবমাননাকর শাস্তি। সারা পৃথিবীতে মুসলিমরা সঙ্গীত সাধনায় মত্ত থাকতে গিয়ে নিজেদের উপর লাঞ্চনা-গঞ্জনা আর অপমানের শাস্তি চাপিয়ে নিয়েছে।

৬.

নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি – গান শোনা ছেড়ে দেয়াটা বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। কিন্তু শিরক-কুফরি ভর্তি গানের সাথে কোন আপোষ থাকতে পারেনা। আর বাজনা আছে এমন গান শোনা ইসলাম সম্মত নয় একথা আমাদের স্বীকার করে নিতে হবে। আমাদের মেনে নিতে হবে মিউজিক শুনে আমরা পাপ করছি, নয়তো রসুলের ভবিষ্যদ্বাণী করা দলে আমরা পড়ে যাব। আর যদি আমরা মেনে নেই এটি পাপ তবে সেটা ছাড়ার একটা চেষ্টা আমাদের মনে মনে থাকবে। নয়তো কোনদিনই গান বন্ধ করে মিশারির কন্ঠের ক্বুরান কিংবা ইউসুফ এস্টেসের একটা লেকচার শোনার সুযোগ আমাদের হবেনা।

আমি হাজ্বে গিয়ে আল্লাহকে বলেছিলাম তিনি যেন আমাকে গান থেকে মুক্তি দেন। হাজ্ব থেকে ফিরে এসে দেখলাম যেই আমি গান শোনা ছাড়া একটি দিনও কাটাইনি সেই আমার মধ্যে গান শোনার কোন ইচ্ছাই জাগেনা। এজন্য আমি বলি আমি গান ছাড়িনি, গানই আমাকে ছেড়ে চলে গেছে।

আমাকে ছোটবেলায় মা বলতো, আজ ভাল করে পড়, পরীক্ষা শেষ করে কাল থেকে যত খুশি খেলবি। আমি দশ দিন খেলবো বলে একদিনের খেলা তুলে রাখতাম। আমি অনন্তকাল ধরে অজাগতিক অদ্ভুত সুন্দর সব সুর শুনবো বলে যেকটা দিন বাঁচি সে ক’টা দিন যদি বাজনাওয়ালা গান না শুনে কাটিয়ে দেই তাহলে কি খুব বোকামো করা হবে?

courtesy : Sharif Abu Hayat Opu (sharif.abu.hayat)

Love Music? Think twice!!

**  আ’উজুবিল্লাহি মিনাশ্‌ শায়তানির রাজিম , বিস্‌মিল্লাহির রাহ্‌মানির রাহিম **

সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর যার হাতে আমার প্রাণ। সালাম বর্ষিত হোক প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ওয়া আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর উপর।  আল্লাহ!  এই লেখায় আমার ইখলাসকে শুদ্ধ করে দিন। বিতাড়িত ও অভিশপ্ত শয়তানের ফিতনা থেকে রক্ষা করুন এবং আমাদের সবার উপলব্ধিতে বরকত দান করুন।

 

যখন নিঝুম রাতে সবকিছু চুপ, নিষ্প্রাণ নগরীতে ঝিঝিঁ ঘুমিয়ে পরার পর আপনার মাথায় আরেক জনের কালো ঘর আলো করার জন্যে “চাঁদের আলো” হবার তীব্র ইচ্ছা মোচড় দিয়ে উঠতে পারে …

যেই ইচ্ছা ভুলেও অন্তর নাড়া দেয় না- তা হচ্ছে … যখন রাতের অর্ধেক অতিক্রান্ত হয়, তখন মহান আল্লাহ্‌ পৃথিবীর নিকটতম আকাশে নেমে আসেন এবং বলেন,

“কোন ক্ষমা কামনাকারী আছে কি, যেন আমি তাকে ক্ষমা করতে পারি? কোন তওবাকারী আছে কি, যেন আমি তার তওবা মঞ্জুর করতে পারি?কোন প্রার্থনাকারী আছে কি, যেন আমি তার প্রার্থনা কবুল করতে পারি?” (ততক্ষণ পর্যন্ত এ আহবান চলতে থাকে) যে পর্যন্ত না ফজরের উদয় হয়।

(আহমদ এ হাদীসটি হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে সংগ্রহ করেছেন।)

 

আপনি গান শুনে থাকলে থাকলে আপনি নিজেই জেনে থাকবেন, একটি গানের কলির প্রভাব আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যাপক!! গান শোনাটা যে উচিত না- এটা চিন্তা করাটাই যেন আমরা নিজেদের জন্যে হারাম করে নিয়েছি- আস্তাগফিরুল্লাহ্‌ !

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, পানি যেমন (ভূমিতে) তৃণলতা উৎপন্ন করে তেমনি গান মানুষের অন্তরে নিফাক সৃষ্টি করে।-

(ইগাছাতুল লাহফান ১/১৯৩; তাফসীরে কুরতুবী ১৪/৫২)

উপরোক্ত বাণীর সত্যতা এখন দিবালোকের ন্যায় পরিষ্কার। গান-বাজনার ব্যাপক বিস্তারের ফলে মানুষের অন্তরে এই পরিমাণ নিফাক সৃষ্টি হয়েছে যে, সাহাবীদের ইসলামকে এ যুগে অচল মনে করা হচ্ছে এবং গান-বাদ্য, নারী-পুরুষের মেলামেশা ইত্যাদিকে হালাল মনে করা হচ্ছে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু লোক সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, রেশম, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল সাব্যস্ত করবে।-

(সহীহ বুখারী হাদীস : ৫৫৯০)

একবার চলার পথে আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বাঁশির আওয়াজ শুনলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি দুই কানে আঙ্গুল দিলেন। কিছু দূর গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, হে নাফে’! এখনো কি আওয়াজ শুনছ? আমি বললাম হ্যাঁ। অতঃপর আমি যখন বললাম, এখন আর আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না তখন তিনি কান থেকে আঙ্গুল সরালেন এবং বললেন,

একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চলার পথে বাঁশির আওয়াজ শুনে এমনই করেছিলেন। 

(মুসনাদে আহমদ হাদীস : ৪৫৩৫; সুনানে আবু দাউদ হাদীস : ৪৯২৪)

শুধু হাদীস নয় কুরআনেও এই নিয়ে উল্লেখ আছে-আল্লাহ তাআলা সূরা লুকমানে আখেরাত-প্রত্যাশী মুমিনদের প্রশংসা করার পর দুনিয়া-প্রত্যাশীদের ব্যাপারে বলছেন,

“আর একশ্রেণীর লোক আছে, যারা অজ্ঞতাবশত খেল-তামাশার বস্তু ক্রয় করে বান্দাকে আল্লাহর পথ থেকে গাফেল করার জন্য।-(সূরা লুকমান : ৬)

উক্ত আয়াতের শানে নুযূলে বলা হয়েছে যে, নযর ইবনে হারিস বিদেশ থেকে একটি গায়িকা বাঁদী খরিদ করে এনে তাকে গান-বাজনায় নিয়োজিত করল। কেউ কুরআন শ্রবণের ইচ্ছা করলে তাকে গান শোনানোর জন্য সে গায়িকাকে আদেশ করত এবং বলত মুহাম্মদ তোমাদেরকে কুরআন শুনিয়ে নামায, রোযা এবং ধর্মের জন্য প্রাণ বিসর্জন দেওয়ার কথা বলে। এতে শুধু কষ্টই কষ্ট। তার চেয়ে বরং গান শোন এবং জীবনকে উপভোগ কর।-মাআরিফুল কুরআন ৭/৪এরই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা উক্ত আয়াত নাযিল করেন। একটু ভেবে দেখুন তো, যে আওয়াজ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম মুহূর্তের জন্যও কানে তুলতে রাজি ছিলেন না সেই আওয়াজের অনুকূলে কথা বলার দুঃসাহস আমরা দেখাতে পারি কি না?

বলছি না এক লাফে গান শোনা বন্ধ করে দিতে।সময় লাগবে, আল্লাহ্‌-র কাছে সাহায্য চাওয়া লাগবে, নিয়তের আন্তরিকতা লাগবে … অন্তত গানটা যে শোনা ঠিক হচ্ছে না- এই বিশ্বাস টাই মনে প্রাণে গেঁথে নিন আগে, দেখবেন ইনশাআল্লাহ্‌ বাকিটুকু আল্লাহ্‌ রাব্বুল আ’লামীন কি সুন্দর সহজ করে দিচ্ছেন …

কি ই হবে এমন কিছু শুনে যেটার মোহ আপনাকে আল্লাহ্‌-র স্মরণ থেকে দূরে ছিটকে ফেলে?

courtesy : Sharin Shafi (sharin.odrita)

বিনোদন মানুষকে কি ভুলিয়ে রাখে

বিনোদন মানুষের জীবনের অমূল্য সময় চুরি করে নিয়ে যায় মানুষের অজান্তেই। মানুষ যেন স্বেচ্ছায় নিজেকে ক্ষয় করার বা নিঃশেষ করার ব্রত নিয়ে বিনোদনের জালে ধরা দেয়। আসুন আমরা ভেবে দেখি বিনোদন আমাদের কি কি ভুলিয়ে রাখে:

১। মানুষের ক্ষুদ্রতা ও অসহায়ত্ব: বিনোদনের মাধ্যমে মানুষকে তার ক্ষুদ্রতা ও অসহায়ত্ব ভুলিয়ে রাখা হয়।

বিনোদনে ডুবে থাকলে মানুষ নিজেকে নিয়ে এবং মহাবিশ্বের সাথে নিজের সম্বন্ধ ও সমন্বয় নিয়ে ভাববার মত কোন অবসর পায় না (মাননীয় পাঠক! আপনি যদি ঢাকা শহরের বাসিন্দা হয়ে থাকেন, তাহলে একবার ভেবে দেখুন তো শেষ কবে আপনি রাতের তারাভরা আকাশের দিকে ২ মিনিট চেয়েছিলেন? আরেকটু মনে করে দেখতে চেষ্টা করুন – খুব সম্ভবত রাতের তারাভরা আকাশের দৃশ্যটা আপনি শেষ টেলিভিশনের পর্দায় ’মিথ্যা মিথ্যা’ দেখেছিলেন, কোন সিনেমার দৃশ্য হিসেবে!)। বরং সে জল্পনা-কল্পনার এক বায়বীয় ও তাত্ত্বিক জগতে বসবাস করে – বাকচাতুর্যের এক ছায়াময় জগতে তার আধিপত্যবলে সে নানা রকম তত্ত্ব উদ্ভাবন করতে শুরু করে। আজকালকার সাইন্স ফিকশনের যুগে তো কল্পকাহিনী, কল্পনা আর বাস্তবতা সব মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। আর তাই ’স্ট্রিং থিওরি’ থেকে ’ওমেগা পয়েন্ট’ এর মত কত বিচিত্র সব ’থিওরির’ উদ্ভব ঘটছে এবং ঘটবে। একজন মুসলিমকে মনে রাখতে হবে যে এসব তত্ত্ব কোন প্রতিষ্ঠিত সত্য নয় – suggestion বা সুপারিশ মাত্র। তাই ’থিওরি’ আসবে এবং ’থিওরি’ যাবে, এরই মাঝে আমাদের অবিচল ভাবে এই বিশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে যে, সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তা কোন থিওরির variable নন বরং এই মহাবিশ্বের সবকিছু তাঁর মুখাপেক্ষী – আর তিনি যে সত্য আপনাকে জানিয়েছেন, তাই একমাত্র অপরিবর্তনীয় ধ্রুব সত্য। Big Bang বা Black Hole নিয়ে চিন্তা করে নিজেকে বিশাল একটা কিছু মনে করা মানুষ, আসলে, কত অসহায় যে নিজের পিঠটাও প্রয়োজনে সে ঠিক মত চুলকাতে পারে না – আর এসব নিয়ে সবচেয়ে বেশী যারা ভেবেছেন তাদের অন্যতম Stephen Hawking-এর কথা ছেড়েই দিলাম, কারণ তিনি তো প্রতিবন্ধী, স্বাভাবিক মানুষও নন, নিজের কথা নিজে বলতেও পারেন না। অথচ, আমাদের দেশের “কার্যত অবিশ্বাসী” আঁতেল মানুষজন থেকে শুরু করে, পৃথিবীর তাবত সন্দেহবাদী মানুষ Stephen Hawking-এর মত ”বিশাল” বিজ্ঞানীদের মুখের দিকে চেয়ে থাকেন আল্লাহ্ সত্যি আছেন কিনা সেটা নিশ্চিত করার জন্য।

২। মানুষের মৃত্যুপথযাত্রা: বিনোদনের মাধ্যমে মানুষকে তার মৃত্যুপথযাত্রা ভুলিয়ে রাখা হয়।

জন্মের পর মুহূর্ত থেকে মানুষ যে মৃত্যুপথযাত্রী সেটা ভুলিয়ে রাখার জন্যই মূলত পৃথিবীর সব বিনোদনের আয়োজন। ধরুন আপনি অনেক আয়োজন করে, বন্ধু-বান্ধব-আত্মীয়-পরিজনকে সাথে নিয়ে ছুটি কাটাবেন বলে একটা গাড়ীতে করে রওয়ানা করেছেন। আপনি কোন একটা হাইওয়েতে গাড়ী ছুটিয়ে চলেছেন – আপনার মন খুব প্রফুল্ল, আপনি ক্যাসেট/সিডি প্লেয়ারে চড়া ভল্যুমে গান শুনছেন। হঠাৎ দেখতে পেলেন রাস্তাটা শেষ হয়ে গেছে মাত্র কয়েক গজ দূরে গিয়ে – কয়েকশ ফুট নীচে একটা পাহাড়ী নদী বয়ে চলেছে। খুব ভয়ঙ্কর দিবা-স্বপ্ন বা দুঃস্বপ্ন তাই না? আপনার কাছে তখন আপনার আত্মীয়-স্বজন-বন্ধু-বান্ধবের চিন্তা, তাদের নিয়ে আনন্দ-ফুর্তি করার কল্পনা বা পরিকল্পনা সব একেবারে অর্থহীন হয়ে দাঁড়াবে। কারণ আপনি জানেন উবধঃয Death comes as the end – মরণের যাত্রাটা একমুখী, কেউ কখনো জীবনের ঐ সীমারেখা পার হয়ে গেলে আর ফিরে আসে না। মাননীয় পাঠক! ব্যাপারটাকে যতই দুঃস্বপ্ন বা দিবাস্বপ্ন মনে হোক না কেন, আমরা, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ, আসলে জীবনের বাহনে এরকম একেক জন যাত্রী, যাদের জীবনে যে কোন মুহূর্তে রাস্তাটা হঠাৎ করে অসীমের মাঝে শেষ হয়ে যাবে। সেই পথের প্রান্ত কার জন্য কত দূরে তা কেউ জানে না জানলে কি John Denver বা Kennedy Junior কেউ তাদের নিজ নিজ উড়োজাহাজে ঐ নির্দিষ্ট দিনে চড়তেন? চড়তেন না নিশ্চয়ই! সে যাহোক পথ কখন শেষ হয়ে যাবে, তা না হয় না জানতে পারি আমরা; কিন্তু ধরুন একটু আগে আপনাকে যে গাড়ীর চালক হিসেবে নিজেকে কল্পনা করতে বলেছিলাম, সেই গাড়ীতে আপনি যখন যাত্রা শুরু করলেন তখনই যদি জানতেন যে, ঐ যাত্রার স্থায়ীত্ব কতটুকু তা না জানলেও ঐ যাত্রাই আপনার শেষ যাত্রা, তাহলে আপনার কেমন লাগতো? পৃথিবীর কোন প্রলোভন, লোভ বা মোহ কি আপনাকে Seduce করতে পারতো? তেমনি মৃত্যুর অনিবার্যতা কেবল ভাসা ভাসা ভাবে মনে জন্মালেও, সৃষ্টির সেরা জীব হয়ে, একটা পর্দার সামনে বসে, সময় এবং পয়সা ব্যয় করে Manufactured, devised ও engineered সব “মন-পসন্দ” বা ’মন যারে চায়’ মার্কা TV প্রোগ্রাম দেখে আপনি, আপনার জীবনের reality বা অপ্রতিরোধ্য বাস্তবতা: মৃত্যুকে, ভুলে থাকতেন না। আপনার অহেতুক ফুর্তি লাগতো না এবং আপনি বুঝতেন জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত প্রবল গতিতে সাঁই সাঁই করে আপনাকে পাশ কাটিয়ে চলে যাচেছ Rudyard Kipling-এর From a Railway Carriage-এর দৃশ্যাবলীর মত। আপনি তখন বুঝতেন, জীবনকে সুসংহত করা দরকার, প্রস্তুত করা দরকার ঐ অনিবার্যতার জন্য। আপনি বুঝতেন জীবনে আসলে ফুর্তির যা আনন্দের বিশেষ কিছু নেই। বরং ভাববার রয়েছে অনেক কিছু – করার রয়েছে অনেক কিছু – অথচ পরীক্ষার হলে ’শ্লথ-হাতের-লেখা-সম্পন্ন’ ছাত্রের মত, আপনার জীবনে সময় অত্যন্ত সীমিত। আপনার মন বিষন্ন হয়ে যেতো – আপনি কেবলই ভাবতেন আপনার পথের প্রান্ত কতদূরে? কখন জানি পরীক্ষার খাতায় লেখা বন্ধ করার ঘন্টাটা বেজে ওঠে? আর তাই আপনাকে ঐ বাস্তবতা ভুলিয়ে রাখতে পৃথিবীতে যত খেলাধূলা, ছায়াছবি, নাটক, টিভি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ক্যাবারে, স্ট্রিপটিজ ইত্যাদি সব কিছুর আয়োজন।

৩। মানব জনমের সার্থকতা: বিনোদনের মাধ্যমে মানব জনমের পূর্ণতা ও সার্থকতা কিসে তা ভুলিয়ে রাখা হয়।

কতকটা আপনি চান বলেও হয়তোবা, কিন্তু মূলত আপনাকে যেন “cog in a machine” বানানো যায় সেজন্য বিনোদনের প্রয়োজন – আপনাকে একটা ঘোরের ভিতরে নিয়ে যাবার জন্য, যে অবস্থায় sleep walker-দের মত আপনি ঘুমিয়ে থেকেও অনেক কিছু করতে পারবেন, সচেতন না হয়েও। আপনি কোন প্রশ্ন না করে অবিশ্বাসী বস্তুবাদীদের ভোগ সুখের যোগান দিতে কেবল কিছু মাসোহারার বিনিময়ে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করবেন। পশ্চিমা বিশাল শিল্পনগরীগুলোর কর্মজীবী মানুষদের জীবন কেমন হয়? কাজ, ফিরে এসে বিয়ার নিয়ে টিভির সামনে বসা, খাওয়া, ঘুমানো তারপর আবার কাজ। কোন চিন্তা ভাবনা বা মনে কোন প্রশ্ন জাগার অবকাশ বা সুযোগ নেই। এই অবস্থাকেই রাসেল ‘cog in a machine’ বলেছেন। মেশিনের একটা দাঁত যেমন, নির্দিষ্ট সময় পরে পরে একটা বৃত্তাকারে ঘুরতে ঘুরতে একই স্থান অতিক্রম করে, মানুষও তেমন একটা ঘড়ির কাঁটায় বাঁধা জীবনযাপন করছে আজকের “উন্নত বিশ্বে”। সুতরাং আপনাকে আপনার মানবিক ও মানবসুলভ অস্তিত্ব ভুলিয়ে রাখার জন্য বিনোদনের প্রয়োজন – যেন আপনার মনে সমাজপতিদের নিয়ে কোন প্রশ্ন না জাগে, systemনিয়ে কোন প্রশ্ন না জাগে, বরং আপনি যেন system-এ গা ভাসিয়ে দিয়ে বিশ্বের মুষ্টিমেয় লোভী রাক্ষসের ’ভোগ-সুখের’ যোগান দিতে পারেন। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় “চিরতন হরতন ইস্কাবনের” অতি সনাতন ছন্দে যেন সব কিছু চলে। আপনি কি জানেন কোটি কোটি ডলারের মালিক Drug lord বা Drug king-দের ছেলেমেয়েরা ধূমপান পর্যন্ত করে না বরং Harvard Law School বা MIT-তে লেখাপড়া করে – আপনার আমার ছেলেমেয়েরা, আমাদের যন্ত্রসুলভ জীবন ধারার জন্য মাদকাসক্ত হয়ে তাদের লক্ষ-কোটি ডলারের তহবিলের যোগান দিয়ে থাকে। বিনোদনে আপনাকে এমনভাবে ডুবিয়ে রাখা হবে, যাতে আপনার স্বাভাবিক বোধশক্তিই না থাকে – Australia-তে যেমন কিছু অঞ্চলে aborigine-দের যেন অথর্ব করে রাখা যায় সারাজীবন, তারা যেন কখনো মাথা তুলতে না পারে, সে জন্য তাদের বসতিপূর্ণ এলাকায় মদ্যপানকে সহজতর করে দেয়া হয় এবং এটা একটা Official Policy হিসেবে করা হয়। আমি খবরের কাগজে পড়েছি যে, একটা আদিবাসী অঞ্চলে মেয়েরা সংগ্রাম করছিল, যেন তাদের এলাকায় মদের সহজলভ্যতা রোধ করে, তাদের পুরুষদের অথর্ব হওয়া থেকে রক্ষা করা হয়। আমাদের দেশের চা বাগান গুলোর “কুলি”দের অবস্থা অনেকটা এ ধরনের ছিল বা প্রায় ক্ষেত্রে এখনো আছে। একদিকে অত্যন্ত নিম্নমজুরী বেঁধে দিয়ে তাদের জীবনে অভাবকে স্থায়ী আসন দেয়া হয়, আবার একই সময় মদ্যপান ও নাচগানের মাধ্যমে হাল্কা বিনোদনের প্রশ্রয় দেয়া হয়। তাতে ব্যাপারটা দাঁড়ায় এরকম যে, অভাবী ও দুঃখী বলে সব ভুলে থাকতে (?) মানুষগুলো মদ্যপান ও ফুর্তি করতে গিয়ে সামান্য রোজগারটুকুও হারায় এবং তাদের দুঃখও কখনো ঘোচে না – দুঃখী বলে তারা মদ্যপান করে, আর মদ্যপানে সব হারিয়ে তারা চিরতরে দুঃখীই থেকে যায়। Exploitation-এর নিমিত্তে সৃষ্ট cause and effect বা কার্যকারণের কি অদ্ভুত এক ’পাপচক্র’ !! এভাবে পৃথিবীর অবিশ্বাসী সমাজপতিরা, যারা আমাদের বর্তমান পৃথিবীর পিরামিড বিন্যাসের চূড়ায় রয়েছে, তারা নিশ্চিত করতে চায় যে, তাদের “শ্রমিক পিঁপড়া” শ্রেণীর শোষণের রক্ষ্যবস্তুরা যেন চিরজীবন বিনোদনের নেশায় ডুবে থেকে বাস্তবতা ভুলে থাকে – তারা যেন কোন বিপজ্জনক প্রশ্ন না করে – তারা যেন এতটুকু সচেতন কখনোই না হতে পারে, যতটুকু হলে রুখে দাঁড়াতে পারে। এখানে ছোট্ট একটা কথা বলে রাখি – কোন সমাজ বিজ্ঞানী যদি ইসলাম সম্বন্ধে জানতে চেয়ে কোন মুসলিমকে জিজ্ঞেস করেন যে, “মুহম্মদ (সা.)-এঁর মিশনে কি এমন ছিল যে, মক্কার সমাজপতিরা তাকে শেষ পর্যন্ত হত্যা করতে চাইলো? অথচ, প্রচলিত ধারণা মতে তো ইসলাম শান্তির ধর্ম!” মাননীয় পাঠক, আপনার কাঙ্খিত ও সঙ্গত জবাব কি হবে? আমার জবাব হবে “মানুষের উপর মানুষের প্রভুত্বের অবসান বা মানুষের দাসত্ব থেকে মানুষকে মুক্তি দেয়া ছিল তার মিশনের প্রধান ও ব্যাপক লক্ষ্য।”

৪। অস্তিত্বের বাস্তবতা : বিনোদন অস্তিত্বের বাস্তবতা ভুলিয়ে রাখে।

মাননীয় পাঠক! আপনি কখনো অন্ধকার রাতের পরিস্কার আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখেছেন? অসংখ্য তারার বিশাল মহাকাশের দিকে তাকিয়ে আপনার কি অনুভূতি হয়? আমার তো মনে হয় বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে (পাশে কেউ থাকলেও) বেশীর ভাগ মানুষই একটা নিঃসঙ্গতা বোধ করবে – এই নিঃসঙ্গবোধের মূলে রয়েছে নিজের ক্ষুদ্রতা ও অনুল্লেখযোগ্যতার একটা অনুভূতি। মানুষ পৃথিবীতে একা আসে কিন্তু সেটা সে অতটা মনে রাখে না বা রাখতে পারে না। তবে যেতে হবে একদমই একা, এই বাস্তবতাটা তাকে এক ধরনের নিঃসঙ্গ ও বিষন্ন বোধ করতে বাধ্য করে এবং এটাই স্বাভাবিক। এই নিঃসঙ্গতা থেকে মানুষের মুক্তি লাভের উপায় কি? সাধারণ এই সত্যটা উপলব্ধি করা যে, সে আসলে নিঃসঙ্গ নয়, বরং সে তার সৃষ্টিকর্তার সর্বময় জ্ঞানের আওতায় রয়েছে – রাসূল (সা.) যেমন হিজরতের সময় অন্ধকার গুহায় ভীত হযরত আবুবকর (রা.)-কে বলেছিলেন, “আমরা তো মাত্র দু’জন নই, আল্লাহ্ আমাদের সাথের তৃতীয় জন।” যারা বিশ্বাসী এবং তাকওয়া সম্পন্ন, তারা জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত একথাটা অনুভব করেন। আর নিঃসঙ্গতা দূর করার যে উপায় আল্লাহ্ দেখিয়ে দিয়েছেন, সেই উপায় অবলম্বন করতঃ নিঃসঙ্গতা দূর করতে হবে। আল্লাহ্ যে সাথীকে ’হালাল’ করেছেন, সেই সাথীকে জীবনে গ্রহণ করে, ’আল্লাহ্-অনুমোদিত’ উপায়ে নিঃসঙ্গতা দূর করতে হবে। এছাড়া ভালো মুসলিম হতে হলে সমাজবদ্ধতা বা জামাতবদ্ধতার যে প্রয়োজন, তাতেও আপনা আপনি নিঃসঙ্গতা দূর হবে। কিন্তু তা না করে ব্যক্তিগত “ফুর্তি” আহরণের পশ্চিমা দৃষ্টান্ত অনুসরণ করলে, কোন সমাজবদ্ধতা তো থাকবেই না বরং একটা দেশ বা জাতি কিছু স্বেচ্ছাচারী ’ব্যক্তির’ সমষ্টিতে রূপান্তরিত হবে – শত কোলাহলের মধ্যেও সত্যিকার অর্থে ঘর সংসারের দায়িত্ব নিতে অনিচ্ছুক এই মানুষগুলো যেমন যৌবনে নিঃসঙ্গই থেকে যায়, বার্ধক্যে বিভিন্ন হোমে বা আশ্রমে স্থানান্তরিত হয়ে নিঃসঙ্গই নয় কেবল, বরং তার সাথে প্রত্যাখ্যাত হবার অনুভূতি নিয়ে মৃত্যুবরণ করে।

৫। আপনার মগজ ধোলাই প্রক্রিয়া: আপনার যে মগজ ধোলাই হচ্ছে, বিনোদন তা ভুলিয়ে রাখে।

বিনোদনের আড়ালে যখন আপনার মগজ ধোলাই করা হয়, তখন আপনি সেটা টেরই পান না – বিনোদন সামগ্রী গিলতে গিয়ে মানুষের চেতনা ও বিচারবুদ্ধি এমনভাবে লোপ পায় যে, বিনোদনের মাধ্যমে তার মস্তিষ্কে যে কোন নির্দিষ্ট ’গভীর মর্মবাণী’ প্রোথিত হয়ে যাচেছ, তা সে টেরই পায় না। একটা উদাহরণ দিই: ছোটরা তো বটেই, “আজে বাজে” জিনিস না দেখে, অনেক অভিভাবকরাই ছেলেমেয়েদের নিয়ে ‘Tom & Jerry’-র মত ’নিষ্পাপ’ কার্টুন দেখে তাদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গদান করে কৃতার্থ করে থাকেন। সম্মানিত পাঠক! আপনি কখনো ভেবে দেখেছেন যে ‘Tom & Jerry’-র অন্তর্নিহিত বক্তব্য কি? Reversal of authority বা denial of authority বা reversal of order নিশ্চয়ই! প্রচলিত যে ব্যবস্থা, বিন্যাস বা বাস্তবতা তা হচেছ বিড়াল বড় বা শক্তিশালী – ইঁদুরের উপর তার কর্তৃত্ব থাকবে এবং ইঁদুর তাকে ভয় পাবে। ঠাট্টার ছলে ব্যাপারটাকে উল্টে দিয়ে আসলে শিশু মস্তিষ্কে বাবার বিরুদ্ধে সন্তানকে অবাধ্য হবার এবং স্বামীর বিরুদ্ধে স্ত্রীকে অবাধ্য করে তোলার প্রথম বীজ বপন করা হয়। অর্থাৎ প্রচলিত বা traditional (এবং ইসলামীও বটে) মূল্যবোধের অবসানের প্রয়াস।

৬। জ্ঞানার্জন থেকে বিচ্যুতি: বিনোদনের নামে আপনাকে প্রকৃত জ্ঞানার্জনের প্রয়াস থেকে ভুলিয়ে দূরে সরিয়ে রাখা হয়।

আপনার অজান্তেই আপনাকে জ্ঞানার্জন থেকে দূরে সরিয়ে রাখা বা জ্ঞান বিমুখ করা গেল। গবেষণার ফলাফল বলে যে, যারা সারাক্ষণ TV-র সামনে বসে থাকেন, তারা কোন কিছুতেই মনযোগী হতে পারেন না বিধায় তাদের দিয়ে কোন Serious পড়াশোনা সম্ভব নয়**। বস্তুবাদী অবিশ্বাসী সমাজপতিরা জানে, আপনার জ্ঞানার্জন তাদের জন্য কতটুকু বিপজ্জনক!! তাই, তারা চায় যে যতটুকু জ্ঞান অর্জন করলে আপনি তাদের হয়ে কাজ করবেন, কেবল ততটুকু জ্ঞানই যেন আপনার থাকে – উন্নত বিশ্বের সাধারণ মানুষরা একদিকে যেমন অবিশ্বাসী সমাজপতিদের লাভবান করতে Junk Food খেয়ে পেট ভরে, অন্যদিকে তেমনি Junk পত্রিকা পড়ে তাদের চিত্ত-বিনোদন ঘটে। বৃটেনে যেমন Sun বা Mirror শ্রেণীর পত্রিকা পড়ে তাদের সাধারণ মানুষ, আমেরিকাতে তেমনি People শ্রেণীর সাময়িকী চলে । Economist-এর নাম প্রতি তিনজনে একজন জানলেও (!!) সেটা সৌভাগ্যের ব্যাপার হতো। আপনাকে সত্য থেকে সরিয়ে রাখা বা সত্য অনুসন্ধান থেকে দূরে সরিয়ে রাখা বা ভুলিয়ে রাখা হচ্ছে, বিনোদনের মিডিয়া টাইকুনদের আরেকটা মহান ব্রত। ’খবর’ নামক পণ্য সব সময়ই engineerd এবং fabricated – এখনকার বিশ্বের প্রধান সংবাদ উপস্থাপনকারী সংস্থাগুলো যেহেতু বস্তুবাদী অবিশ্বাসীদের নিয়ন্ত্রণে (বা আরও সঠিকভাবে বললে ইহুদীদের নিয়ন্ত্রণে), সেহেতু তারা আপনাকে যা বিশ্বাস করাতে চাইবে, তাই দেখাবে, এবং আপনিও তাই বিশ্বাস করবেন। দুর্ভাগ্যবশত আপনার মনে হবে যে, আপনার সময়, সঙ্গতি, সামর্থ বা সাহস কোনটাই অতটুকু পর্যাপ্ত নয়, যতটুকু হলে আপনি এসবের বাইরে গিয়ে সত্য অনুসন্ধান করতে পারতেন। </ big>

**দেখুন:Strangers in Our Homes: TV and Our Children’s Minds – Susan R. Johnson,M.D. with comments by Hamza Yusuf Hanson.

মূল লেখাটি এখান থেকে নেয়া – http://www.sonarbangladesh.com/blog/mariner/5771

courtesy : Sharif Abu Hayat Opu

বিনোদন আমার ধর্ম

“…ওরা ওদের ধর্মকে বানিয়েছিল বিনোদন আর তামাশার বস্তু। দুনিয়ার জীবন ওদের করেছিল প্রতারিত। যেভাবে ওরা আজকের দিনটির সাক্ষাতকে ভুলে গিয়েছিল, যেভাবে ওরা আমার আয়াতকে অস্বীকার করেছিল, আজ আমিও সেভাবে ওদের ভুলে যাব।” [সূরাহ আল-আ‘রাফ, ৭:৫১]

► ব্যাখ্যা:

এই আয়াতে আল্লাহ কিয়ামাহর দিনের একটি ভয়াবহ দৃশ্য আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরেছেন। সেইসাথে কারা এই ভয়ংকর পরিণতির মুখোমুখি হবে তাদের পরিচয়ও তুলে ধরেছেন।

আজ আমাদের চারপাশে অধিকাংশ লোকই দীনবিমুখ। শুধু যে দীনবিমুখ, তাই নয়—অনেকে দীন নিয়ে বিদ্রুপ করেন, ধর্মপালনকে স্রেফ আচার-প্রথা বৈ অন্য কিছু মনে করেন না। ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবনের ধোঁকায় পড়ে চিরস্থায়ী পরকালীন জীবনকে ভুলে গেছেন তারা। ভুলে গেছেন চিরস্থায়ী শান্তির নীড় জান্নাহর কথা। [১]

তারা ভুলে গেছেন, কারণ তারা আসলে অগোচরে আল্লাহর কিতাবকেই অস্বীকার করেন। [২]

তারা নিজেরাই তাদের একটি স্বতন্ত্র লাইফ-স্টাইল বা দীন তৈরি করে নিয়েছেন। যেহেতু তাদের মধ্যে পরকালের চিন্তা বা ভয় নেই তাই তাদের এই দীনে রয়েছে ইচ্ছেমতো সংযোজন বিয়োজনের স্বেচ্ছাচার। ইসলামের কিছু বিধিবিধান যদি তারা পালন করেনও, সেটা করেন তাদের নিজেদের খেয়ালখুশি মতো। ইসলামিক বিধিবিধানের যে অংশ তাদের মনমতো হয় সেটা লুফে নেন, যেটা হয় না সেটা ফেলে দেন। [৩]

যেভাবে এই লোকগুলো আল্লাহর বিধানকে ভুলে গিয়েছিল, পরকালকে ভুলে গিয়েছিল, আল্লাহও কিয়ামাহর দিন সেভাবে তাদের ভুলে যাবেন। [৪]

স্রষ্টা তার নিজ সৃষ্টির একটি অংশকে সেদিন ভুলে যাবেন—মানুষ হিসেবে এর চেয়ে বড় লজ্জা, এর চেয়ে বড় বেইজ্জতি আর কিছু হয় না।

পরকাল, পুনরুত্থান, বিচারদিবস—এ ধরনের বিষয়গুলোতে অস্বীকার কিংবা সন্দেহ করার মাধ্যমে মানুষ মূলত তার নিজের স্বল্প জ্ঞানেরই পরিচয় দেয়। এসব বর্ণনা তাদের তাজ্জব করে দেয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মানুষের জ্ঞানের পরিসর যতটা সংকীর্ণ, জগত ও জীবনের সম্ভাবনাগুলো ততটা সংকীর্ণ নয়। [৫]

রেফারেন্স

[১] তাফসীর জালালাইন, পৃ. ৩৯৫।

[২] ফী জ়িলাল আল-কুরআন, পৃ. ৮০।

[৩] তাফসীর আহসান আল-বায়ান, পৃ. ২৭৫।

[৪] তাফসীর ইব্‌ন কাসীর, পৃ. ৭২।

[৫] তাফহীম আল-কুরআন, পৃ. ৩৫।

লিখেছেন : মাসুদ শরীফ

গান-বাজনা: শেষ এখানেই

প্রারম্ভিক কথা:

  • কোন সুসংবাদ কিংবা দুঃসংবাদ শুনলে আপনার মুখ দিয়ে প্রথমে কি কি শব্দ বেরিয়ে আসে। সুবহান’আল্লহ্, আলহামদুলিল্লাহ্ কিংবা আল্লহু আকবার নাকি একগুচ্ছ ইংরেজী অশ্লীল শব্দগুচ্ছ। একটু খেয়াল করুন, যেখানে আপনি সম্পূর্ণ সচেতন আর সুস্থ মস্তিষ্কে  আপনার মনন আর চিন্তাশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সমর্থ হচ্ছেন না, সেখানে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণের কঠিন মুহূর্তে আপনি শাহাদাহ্ দিতে সমর্থ হবেন?
  • কিংবা কোন গান কিংবা সঙ্গীতের মুর্ছনা যখন আপনি মনযোগ সহকারে শুনেন আর তার অস্তিত্ত্ব আর গুন্জন আপনার মস্তিষ্কে রয়ে যায় দীর্ঘক্ষণ কিংবা দীর্ঘদিন। এবার ভাবুন তো, সচল মস্তিষ্ক যেখানে এ ধরনের গুন্জনকে বাধা দিতে সমর্থ নয় কিংবা অবচেতন মনকে তা গ্রাস করে রাখে সেখানে কিভাবে আপনি মৃত্যুর পূর্বক্ষণে শাহাদাহ্ দিতে সমর্থ হবেন?
  • ইমাম আয-যাহাবী তার কিতাবুল কাবায়ের গ্রন্থে এরকম কিছু মৃত্যুর প্রসঙ্গ টেনেছেন যার পরিণতি ছিলো মন্দ। আর এমন পরিণতির কারণ তাদের ধারাবাহিক পাপাচারে নিমজ্জিত থাকা। এরূপ একব্যক্তি যার ছিলো এক মহিলা গায়িকার গানের প্রতি আসক্তি। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে যখন ঐ ব্যক্তি লড়ছিলেন তখন তার ঘরে ঐ মহিলা গায়িকার গান বাজছিল। এ সময়ে একজন শায়খ তার ঘরে উপনীত হয়ে বলেন এসব বন্ধ করে কুর’আন তিলাওয়াত দেয়ার জন্য কিন্তু তখন ঐ ব্যক্তি বলে উঠল তার এসব সহ্য হয় না। সে ঐ মহিলা গায়িকার গানেই শান্তি পায়। এবার বুঝুন তার পরিণতি।

গান-বাজনার প্রকৃত স্বরূপ:

  • আমি এখনো গান হালাল কি হারাম সে প্রসঙ্গ টানছি না। শুধু এটুকু চিন্তা করুন যেখানে গান-বাজনা হয় সেখানকার পরিবেশের কথা। সেখানে থাকে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, সেখানে থাকে মদ কিংবা নেশাজাতীয় দ্রব্যের সহজলভ্যতা, সেখানে থাকে অশ্লীলতা-অভব্যতার ছড়াছড়ি। এবার আপনিই ভাবুন ঐখানকার পরিবেশ কি আপনাকে আল্লাহ্’র নৈকট্য লাভে সাহায্য করবে নাকি সীমালঙ্গনে?
  • কিংবা গানে কি আপনি কখনো শুনেছেন নৈতিকতার কথা, ছ্বলাত আদায়ের তাগিদ কিংবা পিতা-মাতার আদেশ মান্য করার হুকুম। না এসব কখনোই আপনি গানে শুনবেন না। এখানে শুনবেন অবৈধ প্রেম কিংবা সম্পর্কের কথা, আত্মম্ভরিতার কথা, হতাশার স্মৃতিচারণ কিংবা সুললিত নারীকন্ঠে যিনা’র [ব্যভিচার] আহবান।
  • এখানে আপনি শুনবেন LP’র ‘Crawling in my skin…these wounds they’ll not heal’। আর এ গান তো আপনাকে heal করবেই না বরং wounds কে scar বানিয়ে আপনাকে hell এ পাঠাবে। কিংবা Snoop-Dogg’র হেলমেট পরিহিত অবস্থায় গালাগালি। কোন সুস্থ মানুষ কি এরূপ কোন হেলমেট পড়ুয়া ব্যক্তির উপদেশ গ্রহণ করবে? নিশ্চয়ই না। কিংবা Akon এর আত্মম্ভরিতা ‘Me..me…and me’ এ জাতীয় কথাবার্তা যেখানে কেবল প্রবৃত্তিরই জয়গান করা হয় কিংবা কোন নারীর কন্ঠকে শয়তানের স্বরমিশ্রিত করে কুপ্রস্তাবনার দিকে আহবান।
  • সঙ্গীত-তারকাদের দুর্দশার কথা না বলে কেবল যদি তাদের মধ্যে আত্মহত্যাকারীদের তালিকা করা হয় তা অনেক দীর্ঘ হবে। সঙ্গীতের নামে কপটতা, অপরের দুঃখের ফিরিস্তি, আত্ম-গরিমা আর হতাশার বিকিকিনি কেবল সাময়িক মোহ তৈরী করে; যা জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্যকে ভুলিয়ে রাখে। সঙ্গীত তারকাদের পাঁচ মিনিটের মিউজিক ভিডিও কিংবা ষাট মিনিটের আলব্যামে আপনি যা শুনেন আর দেখেন তার সাথে তাদের বাস্তবজীবনের সংযোগ সামান্যই। মূলতঃ তারা মিউজিক ইন্ড্রাস্টি আর দুরাচারী জীবনেরই দাসত্ব করছে।

গান-বাজনার কুফল: 

পূর্ববর্তী সালাফদের অধিকাংশই এ ব্যাপারে একমত ছিলেন যে গান আর কুর’আন একই অন্তরে থাকতে পারে না। এ ব্যাপারে ইবনে তাইমিয়াহ্’র সুস্পষ্ট উক্তি রয়েছে। তারা গানকে বিভিন্ন মন্দ নামে আর গায়ককে বিভিন্ন মন্দ উপাধিতে ভূষিত করেছেন। যেমন এক সালাফ বলেছেন: “গান হচ্ছে যিনা’র রুকইয়া” অর্থ্যাৎ গান-বাজনা ব্যভিচারের ইন্ধন প্রদানকারী।

আর গান মানুষের অন্তরে সৃষ্টি করে কপটতা কিংবা নিফাক। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:

  الْغِنَاءُ يُنْبِتُ النِّفَاقَ فِى الْقَلْبِ كَمَا يُنْبِتُ الْمَاءُ الزَّرْعَ

‘পানি যেমন (ভূমিতে) তৃণলতা উৎপন্ন করে তেমনি গান মানুষের অন্তরে নিফাক সৃষ্টি করে।’[বাইহাকী : ২১৫৩৬; ইগাছাতুল লাহফান ১/১৯৩; তাফসীরে কুরতুবী ১৪/৫২]

সাহাবী ও তাবেয়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী গান ও বাদ্যযন্ত্র বহু গুনাহর সমষ্টি। যেমন : ক. নিফাক বা মুনাফেকির উৎস খ.ব্যভিচারে অনুপ্রাণিতকারী গ. মস্তিষ্কের ওপর আবরণ ঘ. কুরআনের প্রতি অনীহা সৃষ্টিকারী ঙ. আখিরাতের চিন্তা নির্মূলকারী চ. গুনাহের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টিকারী ও ছ. জিহাদি চেতনা বিনষ্টকারী। [ইগাছাতুল লাহফান ১/১৮৭]

কুরআন আর সুন্নাহ্’য় গানের বিধান:

আসলে গান-বাজনার ক্ষতিকারিতা এত বেশি যে তা নাজায়েয হওয়ার জন্য আলাদা কোনো প্রমাণের দরকার পড়ে না। তদুপরি মহান আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বহু ভাষ্য থেকে তা হারাম হওয়া প্রমাণিত। যেমন : আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন:

وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًا أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُهِينٌ

‘আর মানুষের মধ্য থেকে কেউ কেউ না জেনে আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বেহুদা কথা খরিদ করে, আর তারা ঐগুলোকে হাসি-ঠাট্টা হিসেবে গ্রহণ করে; তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর আযাব।’[সূরা লুকমান, আয়াত : ০৬]

গান-গায়িকা এবং এর ব্যবসা ও চর্চাকে হারাম আখ্যায়িত করে তিনি বলেন:

لاَ تَبِيعُوا الْقَيْنَاتِ وَلاَ تَشْتَرُوهُنَّ وَلاَ تُعَلِّمُوهُنَّ وَلاَ خَيْرَ فِى تِجَارَةٍ فِيهِنَّ وَثَمَنُهُنَّ حَرَامٌ

‘তোমরা গায়িকা (দাসী) কেনাবেচা করো না এবং তাদেরকে গান শিক্ষা দিও না। আর এসবের ব্যবসায় কোনো কল্যাণও নেই। জেনে রেখ, এ থেকে প্রাপ্ত মূল্য হারাম।’ [তিরমিযী : ১৩২৯; ইবন মাজা : ২১৬৮] 

অন্যত্র তিনি বলেন:

لَيَشْرَبَنَّ أُنَاسٌ مِنْ أُمَّتِى الْخَمْرَ يُسَمُّونَهَا بِغَيْرِ اسْمِهَا وَتُضْرَبُ عَلَى رُءُوسِهِمُ الْمَعَازِفُ يَخْسِفُ اللَّهُ بِهِمُ الأَرْضَ وَيَجْعَلُ مِنْهُمْ قِرَدَةً وَخَنَازِيرَ ».

‘আমার উম্মতের কিছু লোক মদের নাম পরিবর্তন করে তা পান করবে। আর তাদের মাথার ওপর বাদ্যযন্ত্র ও গায়িকা নারীদের গান বাজতে থাকবে। আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে মাটিতে ধ্বসিয়ে দেবেন। এবং তাদের মধ্যে অনেককে শূকর ও বাঁদর বানিয়ে দেবেন।’[বাইহাকী, সুনান : ১৭৮৪৫; ইবন মাজা : ৪০২০; ইবন হিব্বান : ৬৭৫৮]

তিনি আরও বলেন:

لَيَكُونَنَّ مِنْ أُمَّتِي أَقْوَامٌ يَسْتَحِلُّونَ الْحِرَ وَالْحَرِيرَ وَالْخَمْرَ وَالْمَعَازِفَ

‘আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু লোক সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, রেশম, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল সাব্যস্ত করবে।’[বুখারী : ৫৫৯০]

আরেক জায়গায় তিনি বলেন:

بَعَثَنِي اللهُ رَحْمَةً وَهَدًى لِلْعَالَمِينَ وَبَعَثَنِي لِمَحْقِ الْمَعَازِفِ وَالْمَزَامِيرِ، وَأَمْرِ الْجَاهِلِيَّةِ

‘আল্লাহ তা‘আলা আমাকে মুমিনদের জন্য হিদায়াত ও রহমত স্বরূপ প্রেরণ করেছেন এবং বাদ্যযন্ত্র, ক্রুশ ও জাহেলি প্রথা অবলুপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন।’[মুসনাদ আহমদ : ২২৩৬১ ; বাইহাকী : ৬১০৪]

চার ইমামের ভাষ্য:

গান ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যাপারে ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রাহ.-অভিন্ন সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন। সকলেই গান-বাদ্যকে হারাম বলে আখ্যায়িত করেছেন।

ইমাম মালেক রাহ. কে গান-বাদ্যের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, কেবল ফাসিকরাই তা করতে পারে। [কুরতুবী ১৪/৫৫]

ইমাম শাফেয়ী রাহ. বলেছেন যে, গান-বাদ্যে লিপ্ত ব্যক্তি হল আহমক। তিনি আরো বলেন, সর্বপ্রকার বীণা, তন্ত্রী, ঢাকঢোল, তবলা, সারেঙ্গী সবই হারাম এবং এর শ্রোতা ফাসেক। তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে না। [ইগাছাতুল লাহফান ১/১৭৯; কুরতুবী ১৪/৫৫]

হাম্বলী মাযহাবের প্রখ্যাত ফকীহ আল্লামা আলী মারদভী লেখেন, বাদ্য ছাড়া গান মাকরূহে তাহরীমী। আর যদি বাদ্য থাকে তবে তা হারাম। [আহসানুল ফাতাওয়া ৮/৩৮৮]

ইমাম শাফেয়ী রাহ. শর্তসাপেক্ষে শুধু ওলীমা অনুষ্ঠানে দফ বাজানোর অবকাশ আছে বলে মত দিয়েছেন। কেননা বিয়ের ঘোষণার উদ্দেশ্যে ওলীমার অনুষ্ঠানে দফ বাজানোর অবকাশের বর্ণনা হাদীসে রয়েছে।-জামে তিরমিযী হাদীস : ১০৮৯; সহীহ বুখারী হাদীস : ৫১৪৭, ৫১৬২ মনে রাখতে হবে, এখানে দফ বাজানোর উদ্দেশ্য হল বিবাহের ঘোষণা, অন্য কিছু নয়। [ফাতহুল বারী ৯/২২৬]

শেষকথা:

গান-বাজনার কুফল নিয়ে আলোচনার ব্যাপক অবকাশ রয়েছে। এখানে এর স্বরূপ, কুফল আর শরীয়াহ্’র দলিলসমূহ পেশ করা হলো। এখন আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, সত্য উন্মোচিত হওয়ার পর তার অনুসরন করব নাকি প্রবৃত্তির অনুসরন করবো?

[মুল ভাবনা: ভাই কামাল এল-মাক্কী’র লেকচার  ‘The End of Music’]

Collected From

http://tamingthenafs.blogspot.com

কতিপয় হলকায়ে জিকির আর আমাদের এফএম প্রজন্মের ভালোবাসার গল্প

আমার বাসার নীচতলায় পুরো স্পেসটাই ফাঁকা থাকে, বাড়ির মালিক একটি দরবার শরীফের পীরের মুরিদ। আজকে তাদের পাক্ষিক জিকির দিবস। ঘরভর্তি জনাত্রিশেক লোকের ‘লা ইলাহা এল্লাল্লাহ’ (ইল্লাল্লাহ হওয়া উচিত) চিৎকারে এলাকা প্রকম্পিত হবার অবস্থা। আল্লাহর একত্ববাদকে কেবলমাত্র চিৎকারের মাধ্যমে জনসাধারণের মনে বসিয়ে দেয়ার ভাবনায় এই আয়োজন কিনা তা কে জানে!! বিগত ঘন্টাখানেক ধরেই এই সশব্দ জিকির চলছে। চলবে অন্তত রাত দশটা অবধি… গমগম শব্দে তৈরি হয়েছে এক ভয়াল পরিবেশ, বুকে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। তাদের এই সশব্দ স্মরণশালায় নেই কোন সৌন্দর্য, মাধুর্য, শুনে আত্মায় কোন প্রশান্তি আসে না…

পরিষ্কার মনে আছে, কয়েক সপ্তাহ আগে এমনই একদিন শুক্রবারে, এই জিকির পার্টি চলে যাবার পরে পাশের বিল্ডিং এর ছাদে কোন এক কিশোর/কিশোরীর উপলক্ষে ব্যাণ্ড কনসার্টের আয়োজন হয়েছিল। সেখানে শোনা গিয়েছিলো —“মীরাবাঈ, হেইলা, দুইলা দরবার নাচায়। ঝাকানাকা ঝাকানাকা দেহ দোলানা” — জাতীয় আরো কিছু গান। সেই রাতে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় হোক — সমগ্র এলাকাবাসী দুলছিলো, তাদের কর্ণকুহরে কম্পন উঠেছিল, ইট-কাঠের ঘরবাড়িগুলো থরথরিয়ে কেঁপেছিলো হাই ভলিউমের কাঁপাকাঁপি সাউন্ড সিস্টেমের দুলুনিতে। এমন কনসার্ট হয় হরহামেশাই, প্রয়োজন হয় কেবল একটা উপলক্ষের…

আমাদের দেশের ধর্মীয় বিশ্বাসগুলোও এমনই…

যখন সুভানাল্লাহ (সুবহান আল্লাহ উচ্চারণও সঠিক জানেননা বেশিরভাগই) , আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার পড়ে আরাম করে পেটপুরে খেয়ে, দাঁত খিলাল করে, ধর্মপালনের আত্মতুষ্টিতে ভুগে নরম কোমল বিছানাতে গড়াগড়ি দিচ্ছেন আর্থিক ও শারীরিক দিক থেকে সামর্থ্যবান যোগ্য *মুসলিম ধার্মিক* মানুষগুলো — তখন তাদের সন্তানদেরকে ছিনিয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছে ‘এফএম রেডিও’-তে রাতের প্রথম প্রহরে আয়োজিত ‘ভালোবাসার গল্প’ বা ‘লাভ গুরু’।

রাতে দেরি করে ঘুমাতে যাওয়া, অল্প বয়সে মোবাইল ফোন হাতে পাওয়া, বয়ঃসন্ধিকালের আবেগের একাকীত্বে ভুগা এই প্রজন্মের লক্ষ লক্ষ সন্তান কৃত্রিম রোমান্সের আলাপে মুগ্ধ হয়ে, ডুবে গিয়ে মানসিক খরায় ডুবে যেতে থাকে। স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোর নিঃশেষ সিরিয়ালগুলো, বলিউডি মুভিগুলো, বাস্তবতা বিবর্জিত রোমান্টিক নাটকগুলোর সাথে জুড়ে থাকা এফএম প্রজন্মের সন্তানগুলোর চিন্তার প্রায় পুরোভাগে অনিবার্যভাবেই এইসব প্রেম-রোমান্স দখল করে ফেলে। একদিন তারা জড়িয়ে পড়ে নতুন কোন গল্পে, নতুন কোন উচ্ছ্বাসে। মোবাইল ফোন, ফেসবুকে প্রচুর অশান্তির প্রবাহ, অপ্রয়োজনীয় কথা আর অননুমোদিত উষ্ণতার তরঙ্গ —  যার শেষ কেবলই দুঃসহ অশান্তি আর অনন্ত অশ্রুতে…

এখনকার মোবাইলগুলোতে সহজেই এফএম শোনা যায়, নিষ্পাপ বালক-বালিকারাও সহজেই তা টিউন করতে পারে। জীবনে আদর্শিক আর আনন্দময় কাজ না থাকায় আবশ্যিক অবসরে তারা এফএম কানে লাগায়। ক্রমাগত গান, মিউজিক এসব অনুষ্ঠানের মূল উপজীব্য। গানের সমস্ত কথাই এই প্রেম-ভালোবাসা কেন্দ্রিক হওয়ায়, গানের ফাঁকে আরজে-দের দৌড় থাকে ভালোবাসাকেন্দ্রিক আলাপ আলোচনাত। প্রেমের ভালোবাসা ছাড়া জীবন চলেনা — এমন সব চিন্তা প্রোথিত হয়েই গেছে নতুন প্রজন্মের কাছে এইসব আরজে দের তুচ্ছ নীচ বাতুলতায়। এফএম রেডিও স্টেশনগুলো দিনভর এমন চেতনাকেই ছড়িয়ে দিচ্ছে । প্রকৃতপক্ষে পুঁজিবাদী ভোগবাদী সমাজ ব্যবস্থা তো টিকেই থাকে মানুষের জীবনের উদ্দেশ্যকে ভোগে পরিণত করে দিতে। তাদের চিন্তাচেতনাকে অন্তরীণ করে দিতে চায় বস্তুকেন্দ্রিকতা, শরীরকেন্দ্রিকতার অনন্ত শেকলে।

আমি পারতপক্ষে কখনই এফ-এম শুনিনা। সেদিন ৫ মিনিট কানে এসেছিলো তখনই একটা গান শুনলাম। গানটার লিরিক ছিলো — “মায়াবী মাতোয়ালি, রে চাঁদরূপওয়ালি, হিজাবের আড়ালে কী ঝলক দেখালি”… এই গানটা শুনে আমার চোখ ভিজে এসেছিল আপনা-আপনিই। আধুনিক মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্টে খুব রিসেন্টলি গানটা বানানো হয়েছে। ভয় হয়, না জানি কত হিজাবী বোনকে এই গানের অত্যাচার শুনতে হবে বখাটেদের কাছ থেকে…  যেসব মেয়েরা নিজদের শারীরিক সৌন্দর্যকে আড়াল করে, নম্রতা আর ভদ্রতাকে অর্জন করে জীবন ধারণের চেষ্টা করছেন, এই বিধ্বংসী সংস্কৃতি আর তাদের কীটগুলো দেখছি তাদেরকেও ছেড়ে কথা কইবে না!

যারা আত্মিক জ্ঞানে দরিদ্র, অজ্ঞ আর নির্বোধ, যারা আল্লাহর দ্বীনের সৌন্দর্য দেখেনি, স্বাদ পায়নি কখনো —  তাদের কথা বাদ দিলাম; আমরা যারা বুঝি বলে মনে করি, তারা কি আদৌ কোন সংস্কৃতি তৈরি করছি বা করতে পেরেছি আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্য? আমরা কি আদৌ আমাদের সৌন্দর্যময়তাকে দিয়ে কোন সংস্কৃতির স্রোত তৈরি করে তাতে আমাদের মুসলিম কিশোর-কিশোরীদের প্রবাহিত করতে পারছি? তারা কী নিয়ে বড় হচ্ছে? তাদের মানসিক যেই প্রয়োজন, অডিও-ভিজুয়াল, ক্রিয়েটিভ সেক্টরে — তা তো মৌলিক চাহিদা, সঠিকভাবে পূরণ করতে না পারলে অবশ্যই ভুল জায়গা থেকেই তারা নিবে।

এইসব সংস্কৃতিকে যারা সৃষ্টি করছে, যারা তারুণ্যের উন্মাদনাকে ব্যবহার করে নিপুণভাবে ধ্বংস করছে নীতিবোধ আর পারস্পরিক সম্পর্কের সৌন্দর্যকে, ভালোবাসাকে — তারা তো এর ফল পাবেই। আল্লাহ সবাইকে একটা সময় পর্যন্ত অবকাশ দেন। [১] এরপর, তার হিসাব হবে কঠিন, তার পাকড়াও অত্যন্ত শক্ত। [২]

এফএম রেডিওর মতন সবক্ষেত্রেই চলমান ভ্রষ্ট আর নষ্ট সংস্কৃতির প্রসারে এই দুনিয়াতেই আমাদের পরিবারগুলোতে শান্তি তিরোহিত, সংসারে অশান্তি, চরিত্রহীনতা, বিকৃত চিন্তাধারা বিস্তৃতি — কোথায় আমাদের সৃষ্টিশীল প্রবাহ? আমরা কবে আমাদের করণীয় কর্তব্য করব? কবে জ্ঞানে, বিজ্ঞানে, শিল্পে, সাহিত্য, প্রযুক্তিতে, সংস্কৃতিতে আমাদের পদচারণা হবে নষ্টদের দাস হয়ে নয়, বরং মুসলিমদের নিজেদের মতন করে? সময় এসেছে জেগে ওঠার — সংস্কৃতিকে ঢেলে সাজাবার, সাধ্যমতন…

ভ্রষ্ট আর নষ্টদের এই আগ্রাসন তো সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, যুদ্ধবিমান আর গোলাবারুদের বিধ্বংসী শক্তির তীব্রতার চাইতে কয়েকশতগুণ বেশি শক্তিশালী এই মারণাস্ত্র। বোমা, মেশিনগান, মর্টারে সর্বোচ্চ মারা যাবে একটা প্রজন্ম, একটা এলাকার মানুষদের। এই মারণাস্ত্রে তিলে তিলে ধ্বংস হয় প্রজন্মের পর প্রজন্ম, ভুলে যায় আপন পরিচয়; ধ্বংস হয় পূর্ণ আকারে।

স্বপ্ন কারখানা, তিলোত্তমা নগরী

১৯ অক্টোবর, ২০১২

রেফারেন্স

  • [১] আল কুরআনুল কারীম :: সূরা আন-নাহল : ৬১
  • [২] আল কুরআনুল কারীম :: সূরা আল বুরুজ : ১২
  • [ভিডিও] ইমাম সুহাইব ওয়েব – Understanding Islam and Moderation
  • [ভিডিও] নুমান আলী খান – Take Hold of Your Future

Collected From

Brother

Shopnochari Abdullah 

বাঁশিওয়ালা

প্রবাসী বাংলাদেশীরা বিভিন্ন উপলক্ষে বাঙ্গালি সংস্কৃতিকে বিদেশী ও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পরিচিত করানোর জন্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে আয়োজিত তেমনি একটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন করার জন্য আয়োজক যখন আমাকে ফোন করে বলল,

“ভাবী, আপনার মেয়েকে গান গাওয়ার জন্য দেন, আমার মেয়েও যাবে”। আমরা ভাবলাম ‘ছোট  মানুষ (৫ বছর), অন্য বাচ্চারাও যখন যাচ্ছে, যাক না’। তাছাড়া, আমি জানতে চেয়েছিলাম ‘আয়োজক ভাইয়ের’ কাছে বাচ্চারা কি গান গাইবে? উনি বলেছিলেন, “এসো হে বৈশাখ, আমার সোনার বাংলা, আমরা সবাই রাজা- টাইপের গান”।

যাইহোক, রিহারসেলের দিন আমি মেয়েকে যে বাসায় রিহারসেল হবে সেখানে রেখে আসলাম এবং ৫-৬ ঘণ্টা পরে গিয়ে আবার নিয়ে আসলাম। মেয়েকে জিজ্ঞেস করলাম, “কেমন হল গান শেখা?” সে বেশ খুশিই মনে হল। ইতিমধ্যে জানতে পারলাম একজন জনপ্রিয় বাংলাদেশী শিল্পীও আসছেন এই অনুষ্ঠানে পারফর্ম করার জন্য। আমি যদিও তার গানের সাথে পরিচিত ছিলাম না তারপরও আয়োজকদের উৎসাহ ও উদ্দীপনার বহর দেখে বুঝতে পারলাম শিল্পীর জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী।

 ড্রেস রিহারসেলের কিছুদিন আগের কথা। আমি রিপোর্ট লিখছি আর আমার মেয়ে আমার পাশেই টেবিলে বসে ছবি আঁকছে আর গুনগুন করে গান গাইছে। আমি হঠাৎ করে খেয়াল করলাম সে আমার অপরিচিত একটা গান গাচ্ছে। আমি বললাম, “মাগো, ভলিউমটা একটু বাড়াও, শুনি”। সে বলল, “মা, গানটা কেমন জানি, অন্য রকম। তুমি যেসব গান গাও সেইরকম না। ‘মিনা’ টাইপের ভাষা”। আমার আগ্রহ তো আরও বেড়ে গেল। তারপর সে আমাকে গানটা গেয়ে শোনাল (যতটুকু সে মনে রাখতে পেরেছে)। গানটা বুঝতে আমার সামান্য কষ্ট হচ্ছিলো (কেন সেটা একটু পর বুঝতে পারবেন), তাই ৩-৪ বার সে গানটা রিপিট করলো। মুল গানটা আপনারা সম্ভবত সবাই জানেন, আমি আমার মেয়ের ভার্সনটা লিখছি, “নানটুঘোটকের কথা শুইন্যা, অল্প বয়সে করলাম বিয়া, মোরগ-বিড়াল বলল সবাই নো টেনশন নো চিন্তা……. আগুনেরই গোলা”।

বিস্ময়ের প্রাথমিক ধাক্কাটা কাটিয়ে ওঠার পর আমি তাকে প্রশ্ন করলাম,“ তুমি কি মা বুঝতে পেরেছ, এই গানটার অর্থ? তার উত্তরের সারাংশ হল—“না বোঝার কি আছে? এটা তো খুবই সোজা। একটা মেয়েকে নানটুঘোটক নামের একটা এনিম্যাল  (ঘটক কি জিনিস সেটা তো সে জানে না, তাই ভেবে নিয়েছে ‘সিন্ধুঘোটকের’ মতো কোন প্রাণী) এবং  ‘মোরগ আর বিড়াল’ (মুরুব্বী শব্দ তার কাছে অপরিচিত তাই সে ভেবেছে শব্দটা নিশ্চয়ই ‘মোরগ-বিড়াল’ হবে) মিলে বুদ্ধি দিচ্ছে বিয়ে করার জন্য। কিন্তু এইটা একেবারেই ভালো বুদ্ধি না, কারন ১) এনিম্যালদের (!) বুদ্ধিতে মানুষের কাজ করা উচিত না, আর ২) যাকে বিয়ে করতে বলেছে সে ফায়ার বলের মতো, তার মানে ‘very dangerous, so, watch out’ ”! গান শুনে যে পরিমাণ বেকুব হয়েছিলাম গানের ব্যাখ্যা শুনে তার চেয়ে দ্বিগুণ পরিমাণ বেকুব হলাম!

 এই ঘটনার পর আমি নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশী বাচ্চারা কি ধরনের গান গায়, শোনে, পছন্দ করে  এবং তাদের অভিভাবকরা তাদেরকে কোন ধরনের গানকে তাদের বয়স উপযোগী মনে করেন, সেটা জানার এক ধরনের আগ্রহবোধ করলাম। কারন, আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন  বাচ্চারা ছড়া গান, দেশাত্তবোধক গান, ভক্তিমুলক গান, উদ্দীপনামূলক গনসঙ্গীত, শিশুসুলভ নজরুলগীতি ও রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইত।

যেহেতু আমার টিভিতে বাংলা চ্যানেল নাই আর আমি আলহামদুলিল্লাহ এইসব থেকে নিজেকে অনেকদিন  দূরে রাখতে সমর্থ হয়েছি, তাই এইক্ষেত্রে ইউটিউব আমার একমাত্র ভরসা। সেখানে গিয়ে আবিস্কার করলাম ‘ক্ষুদে গানরাজ’ নামে একটি অনুষ্ঠানের।

মাত্র দুধ দাঁত পড়েছে, সব দাঁত এখনও উঠে নাই, এমন বয়সী বাচ্চাদের এই অনুষ্ঠানে গাওয়া কিছু গানের নমুনা দেখুন :‘খাইরুন লো তোর লম্বা মাথার কেশ’ , ‘আমি কুলহারা কলঙ্কিনী, আমারে কেউ ছুঁইয়ো না গো সজনী’, ‘কার লাগিয়া গাঁথ রে সখি বকুল ফুলের মালা’, ‘নতুন প্রেমে মন মজাইয়া করেছি কি মস্ত ভুল’, ইত্যাদি।

এছাড়াও ‘শিশুতোষ’ কিছু বাংলা মিউজিক ভিডিও পেলাম যেখানে ছোট ছোট বাচ্চারা জুটি বেঁধে গান গাচ্ছে, “ও বানিয়া বন্ধুরে …..মরিয়া গিয়াছে পিয়ার সোয়ামি….”। গানের ভাষা শুনে আমার আক্কেল গুড়ুম! আমার খুব জানতে ইচ্ছা করে এই বাচ্চাগুলো কি এই গানগুলির মর্মার্থ বোঝে, নাকি আমার মেয়ের মত না বুঝেই গান গাইছে? ধরে নিচ্ছি, তারা বোঝে না কারন এই বয়সে তাদের বোঝার কথাও না।  কিন্তু এইসব অনুষ্ঠানের বিচারক ও অরগানাইজাররা (যারা আমাদের দেশের নামীদামী সব শিল্পী ও সেলিব্রেটি) এবং সবার উপরে তাদের বাবা-মায়েরা কোন রুচিতে এই ধরনের কুরুচিপূর্ণ, অশালীন গান গাইতে বাচ্চাদের অনুমুতি দেয় বা উৎসাহিত করে? প্রত্যেকটি জিনিসের জন্য একটি নির্দিষ্ট  সময় ও বয়স আছে, এই কথাটা কি এরা জানেনা ?  দর্শকের সারিতে অভিভাবকদের দেখে আমি মরমে মরে গেলাম, কারন, অধিকাংশ মায়েদের মাথায় ঘোমটা আর কিছু বাবাদের মুখে দাড়ি ! সুবাহান’আল্লাহ!!

 Robert Browning লেখা The Pied Piper of Hamelin (হ্যামিলনের বংশীবাদক) নামে একটি গল্প পড়েছিলাম। এই কল্পকাহিনী মুলক গল্পের সেটিং জার্মানির একটি গ্রাম (হ্যামিলন), যেখানে ইঁদুরের যন্ত্রণায়  সবাই ব্যতিব্যস্ত। হ্যামিলনের মেয়র ঘোষণা করলো, ‘যে এই গ্রাম ইঁদুরমুক্ত করবে তাকে অনেক  পুরস্কার দেয়া হবে’। একদিন সকালে এক অদ্ভুত পোশাকপরা বাঁশিওয়ালার আবির্ভাব হল। সে তার বাঁশীর সুরে মুগ্ধ করে সব ইঁদুর নিয়ে গিয়ে পার্শ্ববর্তী নদীতে ডুবিয়ে মারল। যখন সে তার পুরস্কার নিতে মেয়রের অফিসে আসলো তখন মেয়র ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা তাকে পুরস্কার তো দিলই না, বরং তাকে নিয়ে হাসি-তামাসা করলো। বাঁশিওয়ালা তাঁদের কথার কোন উত্তর না দিয়ে উঠে চলে গেল। সবাই ভাবল, ‘আপদ গেল, অনেক টাকা বেঁচে গেল’। বাঁশিওয়ালা এইবার গ্রামের কেন্দ্রতে গিয়ে আবার বাঁশীতে ফুঁ দিলো। কিন্তু এইবার তার সুরের টানে সম্মোহিত হয়ে বেরিয়ে এলো গ্রামের  সকল শিশু! বাঁশিওয়ালা হাটতে শুরু করলো, তার পেছনে পেছনে সব বাচ্চা। একসময় তারা গ্রামের শেষ  প্রান্তের একটি পাহাড়ের গুহায় ঢুকে গেল এবং গুহার দরজা আপনাআপনি বন্ধ হয়ে গেল। বাঁশিওয়ালার সাথে সাথে গ্রামের প্রতিটি বাচ্চাও হারিয়ে গেল, শুধু রয়ে গেল বাবা-মায়েদের সন্তান হারানোর আর্তনাদ ও বুকভাঙ্গা হাহাকার।

 সেই বাঁশিওয়ালা আবার ফিরে এসেছে! অন্য রূপে, অন্য আঙ্গিকে। তার হাতে এখন মিডিয়া ও কালচারের মনভুলানো বাঁশী। অভিভাবকদের অজ্ঞতা, ব্যাক্তিগত অক্ষমতা, লোভ (অর্থ, খ্যাতি, ‘নিরাপদ’ ভবিষ্যৎ) এর কারনে তাঁদের সন্তানদের সুন্দর ও নিষ্পাপ শৈশব এই সব  বাঁশিওয়ালারা ছিনিয়ে নিচ্ছে। আজ এইসব বাঁশিওয়ালাদের হাত ধরে কিছু কিছু অভিভাবক তাঁদের সন্তানদের মিডিয়ার রংচঙে মোড়কে পেঁচিয়ে পন্য বানাচ্ছে। একটা সমাজে বসবাস করলে সেখানকার কুৎসিত জিনিসগুলো থেকে বেঁচে থাকা ও নিজ সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখা খুব কষ্টকর হয়ে যায়। আমরা সবাই মিলে যদি এখনও সচেতন না হই ও সক্রিয়ভাবে এইসব বাঁশিওয়ালার কবল থেকে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে বাঁচাতে ব্যর্থ হই তাহলে সেই দিন খুব দূরে নয় যেদিন হ্যমিলনের মতো আমাদের দেশের বাবা-মায়েরা শুধু সন্তান হারানোর আর্তনাদ ও বুকভাঙ্গা হাহাকার নিয়ে বাকি জীবন কাটাবে। হে আল্লাহ্‌, আপনি আমাদের সকলকে হেদায়েত দান করুন।

Courtesy : Sefat Mahjabeen

10 D j party.হায় হায় !! আমরা করতে পারলাম না।

দৃশ্য-১

সিভিল”১০ ক্যাফেতে DJ party করছে।একদল তরুন তরুনী তাদের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে অন্ধকারে নাচানাচি করে।সিনিয়র হিসেবে কিছুটা খারাপ লাগল।আহারে আমরা কিছু করতে পারলাম না।তারা তাদের তেজ দেখিয়ে দিয়েছে।

আগে বড় ভাইয়েরা তাদের শেষ semester e এসে জিমনেসিয়ামে DJ naight করত।এখন ১ম সেমিস্টারেই DJ party !!তা  ও ক্যাফেতে??সাব্বাস বেটারা বাঘের বাচ্ছা।

আমাদের করনীয় নিয়ে কিছু প্রস্থবনাঃ

১ আগামী batch গুলো আসার সাথে সাথেই যেন DJ party  করতে পারে তার ব্যবস্থা করে দেয়া।

২সম্ভব হলে একটু আধটু হুইস্কি,স্যাম্পেইন,এফসাদ ব্যবস্থা থাকতে পারে।

৩ রাতব্যাপী যেন হয় সে ব্যবস্থা করা যেতে পারে

৪ আলাদা  Dj hall করার জন্য ভিসি বরাবর প্রস্থাবনা।

 ২য় দৃশ্যে এর মিনিং খুঁজে নিন

দৃশ্য-২

১ জাহাংগীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মানিক নামের এক নেতা ১০০ ধর্ষন করে সেন্চুরী গৌরব অর্জন করেছে ?এজন্য প্রত্যেক নেতাদের তাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে।

 ২.জামিল সাহেব লক্ষ  লক্ষ টাকা ঘুষ খেয়ে দুইটা বাড়ি বানিয়েছে, আমাকে তার চেয়ে বেশি খেতে হবে।আমি চারটা বানাব।

আদিম যুগের (!)(নাউযুবিল্লাহ) নীতিকথা-

   “যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও,তবে তিনি তোমাদের পরিবর্তে অন্য জাতিকে প্রতিষ্ঠিত করবেন, এরপর তারা তোমাদের মত হবে না।সুর মুহাম্মদ-৩৮

কি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে???

‘তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে।“আলে ইমরান-১১০

ইহুদীদের সাথে আল্লাহর কোন ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল না যে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে নাই বলে তাদের ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল,আর আল্লাহর সাথে আমাদের খুব একটা ভাল সম্পর্ক আছে বলে মনে হয় না যে আল্লাহ আমাদের মাফ করে দিবেন।

বিশ্বাস করুন আমরা আমাদের নিজেদের ধবংসের নকশা আমরা নিজেরাই তৈরি করছি।

বিঃদ্রঃ নোটটা পড়েই এটা গুঢ় মিনিং বুঝার জন্য ঠান্ডা পানিতে গোসল দিয়ে যোগাসনে বসে চিন্তা করতে হবে।

 আসলে আমরা কেন লজ্জিত??

  ১ এ রকম আমরাও আয়োজন করতে পারি নাই বলে??

  ২ নাকি এ রকম কাজকে বাধা দিতে পারি না বলে???

প্রশ্নটি অতীব মস্তিষ্ক চর্চার খোরাক জোগায়……………………।

courtesy : MuZahid Rasel (muzahid.rasel)

কনসার্ট শ্লীলতাহানির হাতিয়ার !!

শ্লীলতাহানি অতীতেও ছিল বর্তমানেও আছে, দিনদিন এর প্রকোপ মহামারী আকারে বাড়ছে। খুবই আশ্চর্যের বিষয় যে শ্লীলতাহানি ঘটছে দেশের সবচেয়ে নামীদামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে, ঘটছে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উৎসবে। থার্টি ফার্স্ট নাইটে বাঁধনের শ্লীলতাহানি মিডিয়ায় যে তুমুল ঝড় তুলেছিল তার পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এ ধরণের অপকর্ম চীরতরে বিলুপ্ত হওয়াটাই সচেতন মানুষের আকাঙ্খা ছিল, কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নারীদের সম্ভ্রম লুটের মহোৎসব বেড়েই চলেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাসভবনের সামনে প্রভাতফেরী থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জসিমউদ্দিন হল শাখার ছাত্রলীগ সভাপতি আব্দুর রহমান জীবনের অনুসারীরা সবার সামনেই ওড়না টানে, অভিবাবকসহ ছাত্রীকে শারিরীকভাবে লাঞ্ছিত করে। গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে সেই আবদুর রহমান জীবনের সংগঠন ‘মুক্তবাণ সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংসদ’ আয়োজিত নববর্ষ কনসার্টে আবারো নারীরা লাঞ্ছিত হলো, কমপক্ষে ১৫ টি মেয়েকে পুলিশ উদ্ধার করে বাড়ীতে পৌছে দেয়।শিক্ষার্থীসহ অন্য প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, কনসার্ট চলাকালে পুরো এলাকার হাজার হাজার মানুষের ভিড়ের মধ্যে মেয়েরা এসে পড়লে বখাটেরা তাদের লাঞ্ছিত করে।

এর আগে গত ৩০ জানুয়ারী রাতে আনন্দমোহন কলেজের শতবর্ষ বরণ অনুষ্ঠানে একদল তরুণ পুলিশ-র‌্যাব, রাজনৈতিক নেতা ও কলেজের শিক্ষকদের সামনেই পাঁচশতাধিক নারীর শ্লীলতাহানি করে। প্রত্যক্ষদর্শী এক উদ্ধারকর্মী যুবকের ভাষ্যমতে তিনি নিজেই সজ্ঞাহীন ৪০ থেকে ৫০ জন নারীকে উদ্ধার করতে দেখেছেন। অবস্থা দেখে মনে হয় নারীদের শ্লীলতাহানির হাতিয়ার হিসেবেই হয়তো ঘটা করে রাতবিরাতে কনসার্টের আয়োজন করা হয়।

সমাজে একদল মানুষ থাকে সুযোগ সন্ধানী। এরা কখনো অন্ধকারে ঘাপটি মেরে থাকে, কখনো বা জনসমুদ্রের মাঝে লুকিয়ে থাকে, সব সময়েই এদের উদ্দেশ্য নারীদের কৌমার্য হরণ। বৈশাখী উৎসব, মঙ্গল শোভাযাত্রা, বৈশাখী মেলা, বিভিন্ন কনসার্ট, ক্রীড়া অনুষ্ঠান, বিয়ে বাড়ী সব খানেই নারীদেহ ছুঁয়ে দিতে এদের বিচরণ। যেখানেই ভীরবাট্টা, সেখানেই চলে আসে এরা, কখনো একাকী, কখনো বা সদলবলে। এদের বিচরণ পাবলিক পরীক্ষার গেটে শিক্ষার্থীদের ভীরে, এদের বিচরণ পাবলিক পরিবহণে, মোট কথা যেখানেই ভিড় আছে, আছে হুড়োহুড়ি, ধাক্কাধাক্কি, সেখানেই এরা নিঃশব্দে ঢুকে পরে। সকাল বেলা কিংবা গভীর রাতে যখন বাসগুলো ভরে ওঠে গার্মেন্টের নারী কর্মীদের ভীরে, এরা ঠিকই ঠেলে ঠুলে জায়গা করে নেয় তাদের মাঝে, চলে সুযোগের ব্যবহার, চলে হাতাহাতি।

অতীতেও এমনটি ছিল, তবে এ সম্পর্কে অভিভাবকদের ছিল সতর্ক দৃষ্টি। এ কারণে যেখানে ভিড় বেশী সেখানে মেয়েদের ভিড়তে দিতে নারাজ ছিলেন আগের যুগের মা-বাবারা। প্রায়শঃই দেখা যায় বিয়ে বাড়ীতে বর কনের বাসর যাপনের আগেই বেয়াই বেয়াইনদের বেআইনী ক্রিয়াকর্মে বিয়ে বাড়ী অশুচি হয়ে ওঠে। এ কারণে আগেকার দিনে বিয়ে বাড়ীতে মেয়েরা থাকতো অভিভাবকদের কড়া নজরে। মেলা-উৎসবে মেয়েদের যাওয়া রীতিমতো নিষিদ্ধ ছিল। সে কারনেই আগেকার দিনে নারীদের শ্লীলতাহানির সংবাদ খুবই কম শোনা যেত।

কিন্তু ইদানিং দিন বদলেছে, নারীদেরকে তাদের স্বাধীনতার কথা বলে টেনে আনা হয়েছে পুরুষের মিছিলে। অথচ যে পুরুষেরা তাদেরকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়ে পুরুষের প্রতিদ্বন্দী করে তুলেছে সেসব পুরুষেরা নারীকে নিছক যৌনসামগ্রী ছাড়া অন্যকিছুই কি ভাবে? একবার ভেবে দেখা উচিত। নারীরা যদি অন্তঃপুরে অভিভাবকদের নজরদারিতে থাকে তবে বিয়ের আগে কোন পুরুষের পক্ষেই সহজে নারীদের শিকার করা সম্ভব হয় না, তাই নারী শিকারী পুরুষেরা নারীদেরকে অন্যায়ভাবে, অনৈতিকভাবে ভোগের জন্যই মূলত রাস্তায় নামিয়ে আনে। নারী স্বাধীনতার নামে নারীদের শুধুমাত্র ব্যবসায়ে পন্যের খদ্দের ধরার টোপ হিসেবেই ব্যবহার করা হচ্ছে। ইদানিং যত বিজ্ঞাপন দেখা যায় তাতে পণ্যের গুণগাণের চেয়ে নারীদের বিশেষ কোন অঙ্গের প্রদর্শনীই বেশী গুরুত্ব পায়। সবকিছুই নারীরা দেখেন, নারীদেরকে যে সুন্দর সুন্দর কথার আড়ালে পুরুষরা বিভিন্নভাবে ব্যবহার করছে হয়তো নারীরা ঠিকই বুঝেন, তবু্ও তারা জেনেশুনে বিষপান করতেই পছন্দ করেন কিনা আমার বোধগম্য নয়।

আমরা যারা এ ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি তাদের সবারই উচিত এ সময় থেকে শিক্ষা নেয়া। এ সময়ের পুরুষদের নৈতিকতাবিরোধী অশ্লীল কর্মকান্ডের প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী আমরা সবাই। আমাদের সবার উচিত আমাদের এ সময় এবং আমাদের বাপ-দাদাদের সময়ের মাঝে নির্মোহ বিচার-বিশ্লেষণ করা। আমরা যারা বাবা হয়েছি, হয়েছেন যারা সন্তানের মা, সবার উচিত উদারতা, স্বাধীনতা আর সমানঅধিকারের নামে গো ধরে বসে না থেকে সুন্দর একটা সমাজ গঠনে নারীদেরকে তাদের যোগ্য মর্যাদা দেয়া। শিশুদের আমরা সবচেয়ে বেশী ভালোবাসি, তবুও তাদেরকে এমন স্বাধীনতা দেয়া পছন্দ করি না যার ফলে তারা হামাগুড়ি দিয়ে গনগনে চুলোর আগুনে গিয়ে পরে, ঠিক তেমনি এমন স্বাধীনতাও আমাদের ছেলে মেয়েদের দেয়া উচিত নয় যাতে তারা মানুষরূপী হায়েনাদের শিকারে পরিণত হয়। আর যদি সন্তানদেরকে পূর্ণ স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে দিতে চাই তবে অবশ্যই এসব হায়েনাদের গলে শরীয়াহ আইনের শেকল পড়াতে হবে, প্রকাশ্যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে যাতে কোন হায়েনার পক্ষেই দন্ত নখর বের করে হামলে পড়ার সাহস কখনো না হয়।

 (সংগৃহীত)